ঝিনাইদহ প্রতিনিধি : ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে দিন দিন বেড়ে চলেছে মাটি খেকোদের দৌরাত্ম্য। প্রশাসন প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করলেও কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে এসব মাটি খেকো। কেউ কেউ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে কৃষিজমির টপ সয়েল ও পুকুর খনন করে মাটি বিক্রি করছেন ইটভাটায়। কেউবা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা, পুলিশ ও সাংবাদিকসহ স্থানীয় নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে চালিয়ে নিচ্ছেন এই অবৈধ ব্যবসা। এতে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ ট্রলি যুক্ত ট্রাক্টর, যেগুলোর কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে, আবার কেউ হচ্ছেন পঙ্গু। এসব অবৈধ যানবাহনের সড়কে চলাচলের ফলে নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক। জেলার ছয়টি উপজেলাতেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বোরো মৌসুমের আর বেশি সময় বাকি নেই। কৃষকদের বীজতলায় শোভা পাচ্ছে সবুজ ধানের চারা। সদ্য রোপণ করা আমন ধান কেটে ঘরে তুলেছেন কৃষকরা। ফলে অনেক জমি এখন খালি পড়ে আছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু মাটি খেকো কৃষিজমির টপ সয়েল কেটে নিয়ে ইটভাটায় বিক্রি করছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি এবং কমে যাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা। এসব মাটি বহনে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ ট্রলি যুক্ত ট্রাক্টর। উচ্চ শব্দে মাটি ভর্তি এসব যানবাহন অবাধে সড়ক ও মহাসড়কে চলাচল করছে। এতে সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিনের তুলনায় রাতের বেলায় এসব মাটি খেকো ব্যবসায়ীরা বেশি সক্রিয় থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মাটি ব্যবসায়ী জানান, বিগত বছরগুলোর মতো এবারও স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তা, পুলিশ, সাংবাদিক ও প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করেই তারা মাটির ব্যবসা করছেন। অনেকেই বলেন, টাকা দিলে সব ঠিক থাকে, না দিলে শুরু হয় হয়রানি। পুলিশ ও কিছু নামধারী সাংবাদিক বেশি ঝামেলা করে বলে অভিযোগ করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাটি ব্যবসায়ী জানান, সবাইকে টাকা দিয়েই কাজ করতে হয়। টাকা নিলেও কেউ দায় নিতে চায় না। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত এলে আগে থেকেই খবর দেওয়া হয়। এখন নতুন নতুন ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছে। তারা বিভিন্ন নেতার নাম ব্যবহার করে ব্যবসা করছে। তাদের দাপটে আমাদের মতো পুরোনো ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়েছি।
পরিবেশ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের সহকারী পরিচালক মো. মুন্তাছির রহমান বলেন, কৃষিজমির টপ সয়েল রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও প্রান্তিক কৃষকদের নিয়ে ইতোমধ্যে একটি ওরিয়েন্টেশন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. কামরুজ্জামান জানান, কৃষিজমির সিংহভাগ পুষ্টি উপাদান থাকে টপ সয়েলে। কিছু অসাধু ব্যক্তি সেই টপ সয়েল কেটে নিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। টপ সয়েল রক্ষায় কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের নিয়মিতভাবে সচেতন করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ এ বিষয়ে বলেন, কৃষিজমির টপ সয়েল রক্ষায় সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন