আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন অভিযানের জেরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে অভিবাসন কর্মকর্তাদের জড়িত দ্বিতীয় একটি গুলির ঘটনার পর ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য সরকারের মধ্যে তীব্র বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।
বুধবার মিনেসোটায় একজন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) কর্মকর্তার গুলিতে ৩৭ বছর বয়সী এক মা নিহত হওয়ার পর সেখানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ঘটনার পর মিনেসোটা রাজ্য সরকার ও ফেডারেল কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্ণনা দেয়। রাজ্য তদন্তকারীরা অভিযোগ করেন, ফেডারেল তদন্ত থেকে তাদের কার্যত দূরে রাখা হয়েছে।
এর পর বৃহস্পতিবার ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে এক ট্রাফিক স্টপের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বর্ডার প্যাট্রোলের এক এজেন্ট গুলি চালান। এতে এক পুরুষ ও এক নারী আহত হন। স্থানীয় কর্মকর্তারা শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও বলেন, ফেডারেল সরকারের দেওয়া ঘটনার বিবরণ তারা যাচাই করতে পারেননি।
এই দুই ঘটনাতেই ডেমোক্র্যাট গভর্নর ও মেয়ররা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তাদের অঙ্গরাজ্য ও শহর থেকে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের দাবি জানান। উল্লেখযোগ্যভাবে, এসব অভিযান মূলত ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলোতেই পরিচালিত হচ্ছে—যা ট্রাম্পের অবৈধ অভিবাসী বহিষ্কারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ।
ডেমোক্র্যাট নেতা ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো এসব অভিযানকে “অপ্রয়োজনীয় উসকানি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ওরেগনের গভর্নর টিনা কোটেক বলেন,যখন একজন প্রেসিডেন্ট পরিবার ভাঙার পক্ষে অবস্থান নেন এবং যৌথ মূল্যবোধের বদলে ভয় ও ঘৃণার মাধ্যমে শাসন করতে চান, তখন তিনি আইনহীনতা ও বেপরোয়াপনার পরিবেশ তৈরি করেন।”
ফেডারেল কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মিনেসোটা ও পোর্টল্যান্ড—উভয় ঘটনাতেই সন্দেহভাজন অপরাধী ও ট্রাম্প-বিরোধী কর্মীরা তাদের গাড়িকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে একাধিক ক্ষেত্রে ভিডিও ফুটেজ সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিযোগ উঠেছে।
মিনেসোটার ঘটনা
মিনেসোটায় নিহত নারীর নাম রেনে নিকোল গুড। তিনি একজন মার্কিন নাগরিক এবং তিন সন্তানের মা। এক অ্যাক্টিভিস্টের মতে, তিনি আইসিই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য পরিচালিত একটি “নেইবারহুড প্যাট্রোল”-এ অংশ নিচ্ছিলেন।
ফেডারেল কর্মকর্তাদের দাবি, গুড তার গাড়ি দিয়ে একজন আইসিই কর্মকর্তাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে গুডের সমর্থকদের বক্তব্য, ভিডিওতে দেখা যায় তিনি কর্মকর্তার দিক থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশ পরা দুই কর্মকর্তা গুডের গাড়ির দিকে এগিয়ে আসেন। একজন তাকে গাড়ি থেকে নামতে নির্দেশ দেন এবং দরজার হাতলে হাত দেন। গাড়িটি প্রথমে সামান্য পেছনে যায়, তারপর সামনে এগিয়ে ডান দিকে মোড় নেয়। এ সময় তৃতীয় একজন কর্মকর্তা বন্দুক বের করে তিন রাউন্ড গুলি করেন—শেষ গুলিগুলো গাড়িটি তার শরীর অতিক্রম করার পর চালকের জানালার দিকে ছোড়া হয়।
ভিডিও থেকে স্পষ্ট নয়, গাড়িটি কর্মকর্তাকে স্পর্শ করেছিল কি না। গুলির পর ওই কর্মকর্তা দাঁড়িয়েই ছিলেন এবং হাঁটতে দেখা যায়।
ওরেগনের ঘটনা
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) জানায়, পোর্টল্যান্ডে এক সন্দেহভাজন ভেনেজুয়েলান গ্যাং সদস্য তার গাড়ি দিয়ে এজেন্টদের চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। আত্মরক্ষার্থে একজন এজেন্ট গুলি চালান বলে দাবি করা হয়। গুলির পর গাড়িটি ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়।
পোর্টল্যান্ড পুলিশ জানায়, ঘটনার প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে দুইজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ন্যাশনাল গার্ড সতর্ক অবস্থায়
সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ রাজ্যের ন্যাশনাল গার্ডকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছেন।
বৃহস্পতিবার মিনিয়াপোলিসে শত শত বিক্ষোভকারী সশস্ত্র ও মুখোশধারী ফেডারেল কর্মকর্তাদের উদ্দেশে “লজ্জা” ও “খুনি” বলে স্লোগান দেন। কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা টিয়ার গ্যাস ও পেপার বল ব্যবহার করেন।
৫২ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী র্যাচেল হপেই বলেন,আমার মনে হচ্ছে আমরা এক মোড় ঘুরে দাঁড়িয়েছি। জিনিসগুলোকে বদলাতেই হবে।”
তদন্ত নিয়ে বিরোধ
মিনেসোটা ব্যুরো অব ক্রিমিনাল অ্যাপ্রিহেনশন জানায়, ঘটনাস্থলের প্রমাণ ও সাক্ষাৎকারে প্রবেশাধিকার না পাওয়ায় তারা তদন্ত থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। DHS সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম বলেন, এই ঘটনার ওপর মিনেসোটার কোনো এখতিয়ার নেই।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, গুডের কর্মকাণ্ড ছিল “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ” এবং ওই কর্মকর্তা “কৃতজ্ঞতার দাবিদার”।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য ভিন্ন। কমিউনিটি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট পুলিশ ব্রুটালিটির সভাপতি মিশেল গ্রস বলেন,এখানে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। মানুষ কেবল তাদের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী পুলিশি কার্যক্রম ভিডিও করছিল।”
মিনেসোটা ও ওরেগনের এই দুটি ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি, ফেডারেল ক্ষমতা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে তুলেছে। কী ঘটেছিল ঠিক সেই মুহূর্তগুলোতে—তা নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত। রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি