মামুনুর রশীদ, ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি :
নদীমাতৃক বাংলাদেশের সৌন্দর্য চিত্রে ফরিদপুর অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদ নদীগুলোর মধ্যে বিশেষ একটি হলো কুমার নদ।
ভাঙনের তালিকার নদনদীর বিপরীতে খরস্রোত থাকলেও খুব একটা ভাঙন যন্ত্রনা দেখা যায় না বলে কুমার নদের তীরের বসতিরা শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করেন।
ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদী ইউনিয়ন, পৌরসভা ও চুমুরদী ও ঘারুয়া ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে পার্শ্ববর্তী মুকসুদপুর উপজেলায় প্রবাহিত হয়েছে কুমার নদ। অতীতের খরস্রোতা নদটি আশির দশকের সৌন্দর্য চিত্র হারিয়ে আজ বিবর্ণ। যতদূর চোখ যায় দখল আর দখলে ভরে উঠেছেে কুমার নদ। কথিত সংবাদ কর্মী, রাজনৈতিক নেতা, সমাজপতিদের হাতের মুঠোয় হারিয়ে যাচ্ছে শহরের ঐতিহ্যবাহী কুমার নদ।
দিনের পর দিন কুমার নদীর তীরবর্তীদের দুষন-দখলের ভারে হারিয়ে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে শহরের ঐতিহ্য বাহী কুমার নদের পরিধি ইতিহাস। ঠিক যেন যেমন খুশী তেমন দখলের বিশেষ প্রতিযোগীতা।
অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধীনস্থ কর্তা ব্যক্তিরা চুপচাপ থাকায় দিনকে দিন বেপরোয়া গতিতে চলছে কুমার নদের দুতীর দখল বাণিজ্যর বিশেষ প্রতিযোগীতা।
বর্ষা মৌসুমে পানিতে নদী ভরপুর দেখা গেলেও বছরের বাকি সময়ে থাকে মৃত একটা খালের মতন।
আ' লীগ সরকার নদী খননের তালিকায় ড্রেজিং মেশিন দিয়ে নদী খননের কাজ নামমাত্র করা হয়েছিল। নদীর মাটি কেটে নদীর মধ্যে ফেলে দেওয়ায় ভাঙ্গা কুমার নদ খননের নামে কোটি কোটি টাকার ব্যায়ের নদী খনন কোন কাজে আসেনি অভিযোগ স্থানীয় জনগণের। ভাঙ্গা কুমার নদ খরস্রত হারিয়ে মরা খালের চিত্র হিসেবে ফুটে উঠে মূলত ২০০১ সালের শুরুর দিকে।
দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও নদীর খনন সংস্কার না হওয়ায় ধীরে ধীরে নদীর গতিপথ হারিয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় শক্তিশালী মহলের অশুভ দৃষ্টির বিশেষ খোরাকী হয়ে ওঠে কুমার নদ। অশুভশক্তির নেতৃত্ব ধারায় কুমার নদের দুতীরবর্তী দখলদারদের বৈধতার সুযোগে ইতিহাস সমৃদ্ধ কুমার নদ সাধারণ মানুষের কাছে দখল বাজদের সম্পদে পরিণত হয়ে ওঠে।নদী নিয়ন্ত্রিত পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধীনস্থ কর্তা ব্যক্তিরা এবং স্থানীয় প্রশাসন রহস্যজনক নীরবতায় নদের দু'পাড় অবৈধ দখল বাণিজ্যর পাশাপাশি নদী দুষনে বিপর্যস্ত হয়ে কুমার নদের প্রবাহ ও অতীত ঐতিহ্য চরম অস্তিত্ব সংকটে পতিত হলেও বিশেষ নজর দেখা যায়নি সংশ্লিষ্ট বিভাগের। পৌর এলাকার ডাকবাংলো সড়কে পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস দেখা গেলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিযোগ জানাতে অফিসের কাউকে সহসায় পাওয়া যায় না অভিযোগ পৌর বাসীর।
দায়িত্বশীলদের অবহেলা এবং স্থানীয় জনগণের অসচেতনায় আশি দশকের উত্তাল খরস্রোত কুমার নদের বিস্তৃত সীমানা ছোট হয়ে আসছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি দেখা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে কবিতার পঙক্তির মতন আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
বিশেষত নদীপাড়ের বাজার, কলকারখানার দুষিত বর্জ্য, বসতি পরিবারের ময়লা-আবর্জনায় হাজারও মানুষের ব্যবহারযোগ্য জলের উৎস কুমার নদের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী ও নদের পানি দুষিত হওয়ায় বিপর্যস্ত পরিবেশ বহমানে অস্তীত্ব সংকটে যেমন মানুষ তেমনি নদীর জলের মাছসহ জলজ প্রানী।ভাঙ্গা উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে বেষ্টিত কুমার নদকে ঘিরে গড়ে উঠা ভাঙ্গার হাটের বানিজ্যিক ইতিহাসে শত শত নৌযান চলাচল আর বিকিকিনি চলতো সর্বত্র। বড় বড় ঘাসি নৌকায় ঢাকা থেকে পাইকারি আড়তদারা মালামাল কিন সামাজিক ও মৌলিক চাহিদা পুড়ণে সচেষ্ট ছিলেন। ভাঙ্গা, টেকেরঘাট বন্দর, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শিবচর উপজেলা থেকে এ-শহরে সাপ্তাহিক সোমবার ও শুক্রবার হাটবাজার প্রচলন ছিল নদী পথে। নদী পথ এবং কুমার নদের অতীত ইতিহাসের ইতিবৃত্ত জনগণের কাছে এখন স্মৃতি বিজড়িত।
অভিযোগ জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা শাহাদাৎ হোসেন কুমার নদের মধ্যেপাড়া হাসামদিয়ায় পানি উন্নয়নের জায়গা দখল করে ভবন গড়ে তোলেছেন। তার মতন অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা লিজ নেওয়ার পাশাপাশি অনেক নেতাকর্মীরা মালিক হয়ে হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ দখল কর স্থায়ীভাবে নির্মাণ করেছেন কাঁচা পাকা বাড়ি। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এবং ভূমি অফিসে চাকরি করার সুবাদে ছোট ছোট কর্মচারীরা উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কুমার নদের জায়গা দখল দারিত্বেও পিছিয়ে নেই।
ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে জেলা সদরে প্রবাহিত পদ্মা নদী ফরিদপুর সদর, সালথা ,নগরকান্দা, ভাঙ্গা উপজেলার মধ্যে দিয়ে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলা থেকে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদীর সঙ্গে মিশেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য বাহী এই কুমার নদ।
অতীতে সড়ক পথের উন্নয়ন পরিলক্ষিত ছিল না বলে কৃষি নির্ভরশীলতার বন্দর হিসেবে এসব অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভর ছিল নদী কেন্দ্রিক। কালের গর্ভে সময়ের অগ্রগতিতে দিন দিন দখলদারদের রাহুগ্রাসে ছোট হয়ে গেছে কুমার নদের দুকুল ও নদের পরিধি।নাগরিক সমাজের মতে,অপরিকল্পিতভাবে নদী খনন, পৌর এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়নের বাড়ি ঘর নির্মাণ নদী তীরে দখলগত বৈধতা, রাজনৈতিক পালাবদলের হাওয়ায় নদী দখল চেতনায় মানচিত্রে নদীর নাম দেখা গেলেও কুমার নদের বাস্তব গল্প আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় জনগণ জানান, ভাঙ্গা উপজেলা শহরের প্রায় ৩ কিলোমিটার কুমার নদ জুড়ে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
ভাঙ্গা আদালত সংলগ্ন বাজার ও দক্ষিণ পাড়ের প্রধান বাজার এবং নদী তীরে বসতি পরিবারগুলো সকল ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন, পানির বোতল বছরের পর বছর নদের পাড়ে ও নদের পানিতে ফেলায় পুরো নদ এলাকা ও পানিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে।
বাসাবাড়ির টয়লেটের মলমূত্র পাইপ নদের পানিতে সরাসরি ফেলায় নদীর পাড়ে দুর্গন্ধে পথচারীদের হাঁটাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
নদীর পানিতে অক্সিজেন নয় বিষক্রিয়ায় অস্তিত্ব সংকট ও পানি দুষনে মাছ-জলজ প্রানী মরে ভেসে ওঠে। আমিষের ঘাটতি এবং মৎস্যজীবীদের জীবন জীবীকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নদী কেন্দ্রিক জীবীকা নির্বাহ হুমকির মুখেভাঙ্গা উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি একাধীকবার আকর্ষন করা হলেও সুরাহার পরিবর্তে দখল আর দুষন যেন সমানে চলছে উপজেলার প্রাণ কেন্দ্রের মধ্যে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী কুমার নদ দখলের মহা উৎসব।
সিনিয়র সাংবাদিক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ছোট বেলায় বাবা ও চাচাদের সাথে নৌকা বাইচ দেখার জন্য গ্রামের বাড়ি থেকে সকালে নৌকা নিয়ে ভাঙ্গায় আসতাম। কুমার নদের দুতীর জুড়ে বিশাল মেলা বসতো। সেই বিশাল খরস্রোতা নদী আজ মৃত।
বর্ষা মৌসুমে নদীর পানিতে পৌর এলাকা পানিতে ডুবে যায়পানি নেমে গেলে দখলদারদের দখল উৎসব খুবই দুঃখজনক।
চৌধুরী ওয়াহিদ জানান, কুমার নদ শান্ত একটা নদী হলেও একটা সময় অনেক বড় ছিল।ধীরে ধীরে নদীতে পলিমাটি জমে উঠেছে বলে গভীরতাও ছোট হয়ে যাওয়া য় নদী দখলের যুদ্ধ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব নদী তীরের অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দিয়ে নদীর জায়গা পুনরুদ্ধার করা।
ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও দায়িত্বর পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, নদী তীরবর্তী থেকে শুরু করে পৌর এলাকা এবং উপজেলার কোন সরকারি জায়গায় অবৈধভাবে স্থাপণানা গড়ে তোলার বিষয়ে উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের বিশেষ নজরদারি চলছে। সরকারি কেএম কলেজ এলাকায় সরকারি জায়গার গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা দখল মুক্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, কুমার নদের তীরে যদি কোন জায়গা অবৈধ দখলদারের কবলে করে থেকে থাকে শীঘ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে।এবিষয়ে ভাঙ্গা ডাকবাংলো সড়কের পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে একাধিক বার যাওয়ার পরও অফিস বন্ধ থাকায় তাদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
.
রিপোর্টার্স২৪/এস