রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দীর্ঘদিনের ক্ষতিপূরণ বিরোধের অবসান হতে যাচ্ছে। বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত (ইকসিড) বাংলাদেশকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রায় দিয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমান বিনিময় মূল্যে যার পরিমাণ প্রায় ৫১২ কোটি টাকা। এই অর্থ পরিশোধ করবে কানাডাভিত্তিক জ্বালানি কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস।
অথচ বাংলাদেশ সরকার ও বাপেক্স টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস পুড়ে যাওয়া এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবি করেছিল ১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। দাবিকৃত অর্থের তুলনায় রায়ে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক অনেক কম হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনজীবীদের মাধ্যমে পাওয়া রায়ের সংক্ষিপ্তসার থেকে ক্ষতিপূরণের এই অঙ্ক সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেছে। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি এখনো হাতে আসেনি। রায়ের বিস্তারিত পর্যালোচনা করে সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রাথমিকভাবে রায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সম্পূর্ণ রায় হাতে পাওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০০৩ সালে সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় নাইকোকে। খনন কার্যক্রম শুরুর পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন সেখানে দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায় এবং আশপাশের জনপদ, কৃষিজমি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে প্রথমে ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশের আদালতে মামলা করে পেট্রোবাংলা। একই সঙ্গে নাইকোর কাছে থাকা ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মামলাটি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ালে নাইকোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং চুক্তি বাতিলের নির্দেশ আসে। সুপ্রিম কোর্টেও পেট্রোবাংলার পক্ষেই রায় বহাল থাকে।
এর মধ্যেই নাইকো ২০১০ সালে ইকসিডে সালিসি মামলা দায়ের করে দাবি করে, টেংরাটিলা বিস্ফোরণের জন্য তারা দায়ী নয়। জবাবে বাপেক্স ও বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে ক্ষতিপূরণের পাল্টা দাবি উত্থাপন করে। বাপেক্স দাবি করে ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং সরকার দাবি করে ৮৯ কোটি ৬ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণের দাবি দাঁড়ায় ১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
২০২০ সালে ইকসিড ট্রাইব্যুনাল যৌথ উদ্যোগ চুক্তির শর্ত ভঙ্গের দায়ে নাইকোকে দায়ী করে রায় দেয়। তবে সর্বশেষ ক্ষতিপূরণের অঙ্ক প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সংগঠনগুলো।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, শুরু থেকেই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও মামলা পরিচালনায় গাফিলতি ছিল। তার মতে, ক্ষতিপূরণের অঙ্ক কম হলেও রায়ে নাইকোর দায় প্রমাণিত হওয়া একটি নৈতিক বিজয়। তবে সুযোগ থাকলে সরকারের উচিত আপিল করা।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও ক্ষতিপূরণের অঙ্ককে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পেলে তা বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং মামলায় ব্যয় হওয়া অর্থের হিসাবও পর্যালোচনা করা হবে।
এদিকে পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, টেংরাটিলা বা ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের সব স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সম্ভাব্য গ্যাস মজুত এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে। নতুন কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। ইকসিডের চূড়ান্ত রায় হাতে পাওয়ার পর আইনগত পরামর্শ নিয়ে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা হবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম