আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতের বিচারব্যবস্থা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই। মঙ্গলবার লন্ডনে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট আয়োজিত একটি আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি বা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ যদি প্রকাশ্যে আসে, তাহলে তা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে দিতে পারে।’’ তিনি স্বীকার করেন, ভারতে এমন কিছু দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে, এবং সেইসব পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে দ্রুত, সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিতে হবে।
গাভাই জানান, অতীতে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এই ধরনের পরিস্থিতিতে সব সময় দ্রুত ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তাঁর এই মন্তব্য এমন সময় এল, যখন কেন্দ্রীয় সরকার বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে বলে খবর রয়েছে।
প্রধান বিচারপতি গাভাই জোর দিয়ে বলেন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। যদিও বিচারপতি নিয়োগে কলেজিয়াম পদ্ধতি নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু সেই বিতর্কের নিষ্পত্তির চেষ্টা কখনোই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করে করা উচিত নয়। তাঁর কথায়, ‘‘বিচারপতিদের অবশ্যই বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে।’’ তিনি সতর্ক করেন, অবসরের পরে বিচারপতিদের সরকারি পদ গ্রহণ বা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে।
গাভাই বলেন, ‘‘যদি কোনো বিচারপতি অবসরের পর রাজনৈতিক পদে নির্বাচন করেন বা সরকারি পদ গ্রহণ করেন, তবে মানুষ মনে করতে পারে, বিচারপতি হিসেবে তাঁর রায়দানের পিছনে ভবিষ্যতের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা কাজ করেছে। এতে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই আমি এবং আমার অনেক সহকর্মী প্রতিজ্ঞা করেছি, অবসরের পর আমরা সরকারের কোনও পদ গ্রহণ করব না।’’
এই প্রসঙ্গে অতীতে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর রাজ্যসভায় মনোনয়ন এবং কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়-ও সম্প্রতি একই সুরে বলেন, অবসর নেওয়ার পরে এমন কিছু করবেন না যাতে বিচারপতি হিসেবে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি নিয়েও মুখ খোলেন প্রধান বিচারপতি গাভাই । তিনি স্মরণ করান, ১৯৯৩ সালের আগে সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টে বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিত কেন্দ্রীয় সরকার। সেই সময় প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্তির ক্ষেত্রে দু’বার সিনিয়র বিচারপতিদের উপেক্ষা করা হয়েছিল, যা বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের পরিপন্থী ছিল। তিনি বলেন, ‘‘বিচারপতি সৈয়দ জাফর ইমাম এবং বিচারপতি হংসরাজ খন্নার ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। একবার স্বাস্থ্যগত কারণে, আর একবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফলে তাঁদের প্রধান বিচারপতির পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।’’
এই প্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্ট ১৯৯৩ এবং ১৯৯৮ সালে তার যুগান্তকারী রায়ে ব্যাখ্যা করে দেয়, বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘কলেজিয়াম’ গঠন হবে – যার নেতৃত্বে থাকবেন প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর সঙ্গে থাকবেন সর্বোচ্চ আদালতের চারজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য, বিচার বিভাগের উপর রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দূর করা।
বিদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ থেকে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি যে বার্তা দিলেন, তা দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস পুনরুদ্ধারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিচারপতি গাভাই -এর বক্তব্য এও মনে করিয়ে দেয়, বিচারব্যবস্থা কেবল আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র নয়—এটি একটি নৈতিক প্রতিষ্ঠান, যার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব