আন্তর্জাতিক ডেস্ক:হংকংয়ের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ চীন সমালোচক ও গণমাধ্যম উদ্যোক্তা জিমি লাইকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। জাতীয় নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা এই মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে হংকংয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মামলার নিষ্পত্তি হলো, যা সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশটিতে স্বাধীনতা সংকোচন নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও জোরালো করেছে।
৭৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক জিমি লাইয়ের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের ষড়যন্ত্রের দুটি অভিযোগ এবং রাষ্ট্রদ্রোহী লেখা প্রকাশের একটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ের এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটল।
আদালতে জিমি লাই সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন, বেইজিংয়ের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন তিনি।
বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রভাবশালী দৈনিক অ্যাপল ডেইলি-এর প্রতিষ্ঠাতা জিমি লাইকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয় ২০২০ সালের আগস্টে। গত বছর তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সোমবার ঘোষিত সাজা জাতীয় নিরাপত্তা আইনে ‘অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ’-এর সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় পড়েছে।
রায়ে তিন বিচারক বলেন, বিদেশি শক্তির সঙ্গে ‘নিরবচ্ছিন্ন ও সুসংগঠিত যোগসাজশের’ পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন জিমি লাই। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল—এমন অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ হাজির করেছে। এতে অ্যাপল ডেইলি-র কর্মী, বিভিন্ন কর্মী সংগঠনের সদস্য এবং বিদেশিদের একটি নেটওয়ার্ক জড়িত ছিল বলে আদালত উল্লেখ করেন।
বিচারকরা বলেন, এই মামলায় সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে অভিযুক্ত তিনটি ষড়যন্ত্রের মূল মস্তিষ্ক ছিলেন জিমি লাই। সে কারণেই তিনি আরও কঠোর শাস্তির যোগ্য।
এই মামলায় অ্যাপল ডেইলি-র ছয়জন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মী, একজন অধিকারকর্মী এবং একজন প্যারালিগালকেও ছয় থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জিমি লাইয়ের সাজা ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও তাইওয়ান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই রায়কে ‘অন্যায় ও মর্মান্তিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি প্রমাণ করে হংকংয়ে মৌলিক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা মানুষদের চুপ করাতে চীন কতদূর যেতে পারে। তিনি মানবিক বিবেচনায় জিমি লাইকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার বলেন, তার সরকার দ্রুত জিমি লাইয়ের বিষয়টি নিয়ে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে বসবাসে আগ্রহী হংকংবাসীদের জন্য ভিসা সুবিধা সম্প্রসারণের ঘোষণাও দেয় লন্ডন।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় লন্ডনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র যুক্তরাজ্যকে চীনের বিচারিক সার্বভৌমত্ব সম্মান করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, হংকংয়ের আইনের শাসন ও চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করা উচিত।
চীনের রাষ্ট্রীয় পরিষদের অধীন হংকং ও ম্যাকাও বিষয়ক দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, এই রায় স্পষ্ট বার্তা দেয়—জাতীয় নিরাপত্তা আইনকে চ্যালেঞ্জ করলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে।
হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি বলেন, “জিমি লাই অসংখ্য জঘন্য অপরাধ করেছেন। তার কুকর্মের মাত্রা অপরিমেয়।”
স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
২০১৯ সালের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পর থেকে হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে সমালোচনা চলছে, জিমি লাইয়ের বিচার সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ বহু বিশ্বনেতা এই মামলার সমালোচনা করেছেন।
জিমি লাই দীর্ঘদিন ধরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে মার্কিন রিপাবলিকানদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে গুরুত্ব পেয়েছে। ২০১৯ সালের আন্দোলনের সময় তিনি ওয়াশিংটনে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। গত বছর ট্রাম্প সরাসরি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে জিমি লাইকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান।
চীন সরকার ২০২০ সালে হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারি করে, যা তাদের মতে শহরের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ছিল।
জিমি লাইয়ের বন্ধু ও সমর্থকদের দাবি, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভোগা এই গণমাধ্যম উদ্যোক্তা গুরুতর অসুস্থ এবং তার কারামুক্তি প্রয়োজন।
তার ছেলে সেবাস্তিয়ান লাই বলেন, এই রায় তাদের পরিবারের জন্য ‘ধ্বংসাত্মক’ এবং এটি হংকংয়ের আইনি ব্যবস্থার ‘সম্পূর্ণ ধস’-এর প্রতীক। লন্ডনে রয়টার্সকে তিনি বলেন, “দ্রুত কিছু না করা হলে তিনি কারাগারেই মারা যাবেন।” একই সঙ্গে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের যুক্তরাজ্যের উদ্যোগ স্থগিত রাখার আহ্বান জানান।
তবে হংকং পুলিশ জিমি লাইয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে মন্তব্য করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান স্টিভ লি বলেন, তার স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।
বেইজিং ও হংকং প্রশাসনের দাবি, জিমি লাই ন্যায্য বিচার পেয়েছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় সবাই সমানভাবে আইনের মুখোমুখি হচ্ছে।
রায় ঘোষণার দিন আদালতে উপস্থিত থাকার জন্য কয়েক দিন ধরে লাইয়ের সমর্থকেরা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ৬৪ বছর বয়সী সম নামের এক ব্যক্তি বলেন, আমার কাছে জিমি লাই হংকংয়ের বিবেক।
জিমি লাইয়ের আইনজীবী রবার্ট প্যাং আপিলের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, আপিল করার জন্য তার হাতে ২৮ দিন সময় রয়েছে।-রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি