| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

পিতা-মাতার সম্পত্তিতে হিন্দু কন্যার সমান অধিকার

reporter
  • আপডেট টাইম: এপ্রিল ২২, ২০২৬ ইং | ২০:৩০:০৮:অপরাহ্ন  |  ৫৯৩ বার পঠিত
পিতা-মাতার সম্পত্তিতে হিন্দু কন্যার সমান অধিকার
ছবির ক্যাপশন: স্বপন বিশ্বাস

স্বপন বিশ্বাস 

বাংলাদেশ একবিংশ শতাব্দীর একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র, যেখানে নারী-পুরুষ সমতার প্রশ্ন আজ আর কেবল নীতিগত আলোচনা নয়,এটি বাস্তব জীবনের দাবি। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা,সবক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান। অথচ উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে এখনো একটি বড় বৈষম্য রয়ে গেছে, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের জন্য। পিতা-মাতার সম্পত্তিতে হিন্দু কন্যার সমান অধিকার নিশ্চিত করা আজ শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, বরং সময়ের এক অনিবার্য দাবি।
বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন মূলত ব্রিটিশ আমলে প্রণীত প্রাচীন শাস্ত্রীয় বিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই আইনে কন্যারা পিতার সম্পত্তিতে পুত্রদের মতো সমান অধিকার পায় না। অবিবাহিত অবস্থায় তারা কিছু সীমিত সুবিধা পেলেও বিবাহের পর সেই অধিকার কার্যত লোপ পায়। ফলে একজন কন্যা, যিনি তার পরিবারে সমানভাবে অবদান রাখেন, তিনিও সম্পত্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। এই বৈষম্য শুধু আইনি নয়, এটি সামাজিক ও মানসিক দিক থেকেও নারীদের পিছিয়ে রাখে। একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে,কেন এই বৈষম্য এখনো বহাল রয়েছে? এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক রীতিনীতি এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
অনেকেই মনে করেন, ধর্মীয় বিধান পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন সবসময়ই সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কার করা হয়েছে, যেখানে কন্যাদের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে ধর্মীয় বিশ্বাস ক্ষুণ্ন হয়নি, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষ সমতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। তাহলে প্রশ্ন আসে,এই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের বৈষম্য কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বাস্তবে এটি একটি স্পষ্ট অসঙ্গতি, যা দূর করা জরুরি।সমান সম্পত্তির অধিকার নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন নারী যদি পারিবারিক সম্পত্তিতে সমান অংশীদার হন, তাহলে তার আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা শক্তিশালী হয় এবং জীবনের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে তিনি আরও সুরক্ষিত থাকেন।
বিপরীতে, সম্পত্তির অধিকার না থাকলে নারীরা অনেক সময় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা তাদের সামাজিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। গ্রামীণ সমাজে এই বৈষম্যের প্রভাব আরও গভীর। অনেক ক্ষেত্রে কন্যারা তাদের প্রাপ্য অধিকার দাবি করতেও সাহস পান না, কারণ এতে পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। আবার অনেক সময় সামাজিক চাপ ও কুসংস্কারের কারণে তারা স্বেচ্ছায় অধিকার ত্যাগ করেন। ফলে একটি অন্যায্য ব্যবস্থা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমান অধিকার মানে শুধু সম্পত্তি ভাগাভাগি নয়, এটি একটি মানসিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। সমাজকে বুঝতে হবে, কন্যারা কোনো ‘অতিথি’ নয়, তারা পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা যেমন পিতা-মাতার স্নেহ-ভালোবাসা পায়, তেমনি দায়িত্ব ও অধিকারও সমান হওয়া উচিত।
অনেকে আশঙ্কা করেন, এই ধরনের আইন সংস্কার পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করে দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। যেখানে ন্যায়বিচার থাকে, সেখানে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। বৈষম্য বরং অসন্তোষ ও দূরত্ব তৈরি করে। সমান অধিকার পারিবারিক সম্পর্ককে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায্য করে তোলে। সরকার ইতোমধ্যে নারী উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানে নারীর অগ্রগতি প্রশংসনীয়। কিন্তু উত্তরাধিকার আইনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কার না হলে এই অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সময় এসেছে সাহসী ও প্রগতিশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার।এই প্রসঙ্গে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি মানবিক ও ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি বিবেচনা করেন, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সহজ হবে। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, নারী সংগঠন এবং সচেতন মহলকে এই বিষয়ে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। মিডিয়ারও এখানে একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। গণমাধ্যম যদি এই বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে এবং জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে, তাহলে আইন সংস্কারের পথ আরও সুগম হবে। জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা, সেমিনার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, পিতা-মাতার সম্পত্তিতে হিন্দু কন্যার সমান অধিকার নিশ্চিত করা শুধু একটি আইনি পরিবর্তন নয়,এটি একটি সামাজিক বিপ্লব। এটি নারীর মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। একটি আধুনিক, মানবিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে এই বৈষম্য দূর করতেই হবে। সময়ের দাবি এখন একটাই, নারীর অধিকারকে আর উপেক্ষা নয়, বরং সম্মানের সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়া। হিন্দু কন্যাদের সমান সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করেই আমরা একটি সত্যিকারের ন্যায়ভিত্তিক সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।


কবি ও কলামিস্ট 
শালিখা মাগুরা 

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪