আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সামরিক পোশাক পরা, কাঁধে রাইফেল ঝোলানো ইয়াসমা বালোচ ও তার স্বামী ওয়াসিমকে হাসিমুখে দেখা যায় একটি ছবিতে। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তানে আত্মঘাতী হামলার পর ওই ছবিটি প্রকাশ করে বিদ্রোহী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)।
চূড়ান্ত লড়াইয়ের আগে তারা যেমন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল, তেমনি একসঙ্গে শেষ অবস্থান নিয়েছে,এমন বার্তা সংবলিত সম্পাদিত ছবিটি সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে ছবিগুলো যাচাই করতে পারেনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সম্পদসমৃদ্ধ বেলুচিস্তানে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরতেই এ ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে বিদ্রোহীরা।
গত বছর পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় কিন্তু দরিদ্রতম এই প্রদেশে বিদ্রোহী হামলার সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছায়। এতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগসহ অঞ্চলে পরিকল্পিত বৃহৎ প্রকল্পগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ে।
নারী অংশগ্রহণে প্রচারণা জোরদার
দশকের পর দশক ধরে অধিক স্বায়ত্তশাসন ও আঞ্চলিক সম্পদের ন্যায্য অংশীদারিত্বের দাবিতে চলা বিদ্রোহে নারীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, এতে তাদের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বাড়ে এবং সম্প্রদায়ের কাছে এই বার্তা যায় যে লড়াই ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।
তিনি আরও জানান, অনলাইনে বিদ্রোহী নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে সরকার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আলোচনা করছে। বিএলএ’র এক মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি।
জানুয়ারিতে সংগঠনের সবচেয়ে বড় হামলার ঢেউয়ে অংশ নেয় ছয় নারী, যার মধ্যে তিনজন ছিলেন আত্মঘাতী হামলাকারী। ওই হামলায় ৫৮ জন নিহত হন এবং প্রায় অচল হয়ে পড়ে পুরো প্রদেশ, জানিয়েছেন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা হামজা শাফাআত।
এর আগে ২০২২ সালে প্রথম নারী আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর মোট পাঁচ নারী বিএলএ আত্মঘাতী হামলাকারীর তথ্য রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও তিন নারীকে আত্মঘাতী হামলার আগেই আটক করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদিও নারীর সংখ্যা এখনও সীমিত, তবু এটি জাতিগত বেলুচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংগঠনটির বিস্তৃত সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়। সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডির দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক পার্ল পান্ডিয়া বলেন, এই বিদ্রোহ এখন আর কেবল পুরুষ-প্রধান উপজাতীয় বা সামন্ত নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সমাজের বৃহত্তর অংশ এতে যুক্ত হচ্ছে।
নতুন অস্ত্র ও কৌশল
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দাবি, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে ফেলে যাওয়া বিপুল মার্কিন অস্ত্র ভাণ্ডার বিদ্রোহীদের হাতে পৌঁছেছে, যা তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষক আবদুল বাসিত বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে বিএলএ সবচেয়ে সংগঠিত ও প্রাণঘাতী বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
তিনি জানান, সেনা মোতায়েন ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে তারা ড্রোন ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪০০ যাত্রীবাহী একটি ট্রেন ছিনতাইয়ের সময় তারা স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তিও ব্যবহার করেছিল।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ২৭২টি মার্কিন নির্মিত রাইফেল ও ৩৩টি নাইট ভিশন ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ বেলুচিস্তান হামলার পরও অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী রয়টার্সকে বলেন, পাকিস্তানের ভেতরে সক্রিয় সন্ত্রাসীদের হাতে এসব অস্ত্র নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
তবে হামলায় ব্যবহৃত উন্নত অস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কি না বা অন্য উৎস থেকে এসেছে কি না, তা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আফগান বাহিনীকে দেওয়া মোট ৪ লাখ ২৭ হাজার ৩০০ অস্ত্রের মধ্যে ৩ লাখের বেশি অস্ত্র ছিল। পাশাপাশি ৪২ হাজারের বেশি নাইট ভিশন গগলস ও নজরদারি সরঞ্জামও দেওয়া হয়েছিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমন বলেছেন, জো বাইডেনের বিশৃঙ্খল আফগানিস্তান প্রত্যাহার আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বিব্রতকর দিন ছিল, যেখানে ১৩ মার্কিন সেনা নিহত হন এবং সরঞ্জাম তালেবানের হাতে যায়। তবে বিদেশি সরকারের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
কৌশলের বিপজ্জনক পরিবর্তন
জানুয়ারিতে সমন্বিত একাধিক হামলায় বিদ্রোহীরা হাসপাতাল, সরকারি ভবন ও বাজারে হামলা চালায়, বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এবং জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে ৫৮ জন বেসামরিক ও নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন।
নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, প্রায় এক সপ্তাহের লড়াইয়ে ২১৬ জন জঙ্গি নিহত হয় এবং গ্রেনেড লঞ্চার থেকে শুরু করে এক ডজনের বেশি এম-১৬ ও এম-৪ রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র জব্দ করা হয়।
পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি থেকে আসা কিছু নারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতও।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ সন্ত্রাসী কৌশলের বিপজ্জনক বিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব, অনলাইন উগ্রবাদে প্ররোচনা এবং দুর্বল ব্যক্তিদের কৌশলগতভাবে ব্যবহার করার ফল বলে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষক পার্ল পান্ডিয়া বলেন, এখন বিদ্রোহের পদাতিক ও নেতৃত্ব উভয় স্তরেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি