আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ঢাকার শহীদ মিনারে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে ২৬ বছর বয়সী নাহিদ ইসলাম উচ্চারণ করেছিলেন একটি স্লোগান“হাসিনা মাস্ট গো।” সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভ তখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের কঠোর দমন-পীড়নে পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। কয়েক দিনের মধ্যে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন রূপ নেয় সর্বজনীন গণঅভ্যুত্থানে, যার ফল ছিল সরকারের পতন।
সেই আন্দোলনের সামনের সারির মুখ ছিলেন সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র নাহিদ ইসলাম—সাদামাটা পোশাক, কপালে লাল-সবুজ পতাকা বাঁধা এক তরুণ, যিনি নিজেকে তুলে ধরেছিলেন ক্ষমতার বাইরে পড়ে থাকা এক প্রজন্মের কণ্ঠ হিসেবে। পরে তিনি নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করেন।
এখন ২৭ বছর বয়সী নাহিদ ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী। তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন আন্দোলন-উত্তর রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-কে—যা ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর “পুরনো রাজনীতির” বিকল্প গড়ার প্রত্যাশা থেকে জন্ম নেয়।
বিকল্পের প্রতিশ্রুতি
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দল ঘোষণার সময় নাহিদ বলেছিলেন, “জুলাই বিপ্লবের সময় প্রশ্ন উঠেছিল—বিকল্প কে?” এনসিপি সেই বিকল্প হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়—একটি মধ্যপন্থী দল হিসেবে “নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত” গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে।
দীর্ঘদিনের দুই মেরুকেন্দ্রিক রাজনীতিতে—নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি—ক্লান্ত অনেক ভোটারের কাছে এনসিপি শুরুতে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
তবে পরিস্থিতি বদলে যায়, যখন দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং নারীর অধিকারসহ নানা সামাজিক প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান ঘিরে বিতর্ক এখনো তীব্র।
জোট গঠনের পর এনসিপির ভেতরেও ভাঙন দেখা দেয়। উদারপন্থী অংশের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও নারী নেত্রী দল ছাড়েন। তাদের অভিযোগ—দল “প্রতিষ্ঠালগ্নের অঙ্গীকার থেকে সরে যাচ্ছে।”
নাহিদ অবশ্য বলছেন, এটি আদর্শগত নয়, কেবল নির্বাচনী সমঝোতা। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, এটা আদর্শের জোট নয়, নির্বাচনী জোট। সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী লড়াই, সুশাসন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা—কিছু বিষয়ে আমাদের মিল আছে। ৩০০ আসনের মধ্যে এনসিপি জোট সমঝোতায় ৩০টিতে প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াত লড়ছে ২২২ আসনে।
নির্বাচনী অঙ্ক
বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইআরআই-এর জরিপে বিএনপি ৩৩%, জামায়াত ২৯% এবং এনসিপি ৬% সমর্থন পেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি জাতীয়ভাবে বড় শক্তি না হলেও ঘনিষ্ঠ লড়াইয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—বিশেষত সংস্কার প্রশ্নে পরবর্তী দরকষাকষিতে।
ঢাকা-১১-তে লড়াই
নাহিদ নিজে প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা-১১ আসনে—যেখানে অতীতে আওয়ামী লীগের প্রভাব ছিল প্রবল। প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম—দীর্ঘদিনের সংগঠক ও স্থানীয়ভাবে শক্ত অবস্থানের নেতা।
নাহিদ দাবি করেন, তিনি ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা আমাকে তাদেরই একজন মনে করে, বলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, নাহিদের সামনে পথ কঠিন হলেও দুইটি সুবিধা আছে তিনি জুলাই আন্দোলনের মুখ এবং এলাকায় জামায়াতের সংগঠন শক্তিশালী।
সমালোচনা ও শঙ্কা
সমাজকর্মী সামিনা লুৎফা মনে করেন, এই জোটে লাভ বেশি জামায়াতের। “জামায়াত আন্দোলনের কৃতিত্ব নিজেদের বলে প্রচার করছে। এতে এনসিপির চেয়ে জামায়াতই বেশি লাভবান,” বলেন তিনি।
অধ্যাপক শাহানের ভাষায়, এনসিপি সংগঠনগতভাবে দুর্বল। জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে বের হতে চাইলে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ তকমা পেতে পারে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, এনসিপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দিলে সংগঠন গড়ার সুযোগ পেত। জোটে গিয়ে তারা বিতর্ক বাড়িয়েছে, বলেন তিনি।
নারী ও সংখ্যালঘু প্রশ্ন
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সম্প্রতি বলেন, নারীর শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে দলপ্রধান হওয়া সম্ভব নয়—যা বিতর্ক তৈরি করে।
নাহিদ বলেন, এটা জামায়াতের অবস্থান, আমাদের নয়। তিনি দাবি করেন, এনসিপিতে নারীর নেতৃত্বের সুযোগ বেশি। তবে দলটি ৩০ আসনের মধ্যে মাত্র দুইজন নারী প্রার্থী দিয়েছে,যা সমালোচনার মুখে পড়েছে।
ক্ষমতা, ভারত ও আওয়ামী লীগ
নাহিদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা তাকে বুঝিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনা কত জটিল। তিনি ভারতের সঙ্গে “জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থভিত্তিক” সম্পর্ক চান এবং সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলেন।
আওয়ামী লীগ সম্পর্কে তার অবস্থান কঠোর: “তাদের রাজনীতি করার অধিকার নেই।” তবে সমর্থকদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষে তিনি।
ভবিষ্যতের পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন নাহিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পরীক্ষা। এনসিপি যদি পাঁচটির কম আসন পায়, দলীয় ভেতরে চ্যালেঞ্জ বাড়তে পারে।নাহিদ নিজে ১০ বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন—এই সময়ের মধ্যে দল সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে তিনি রাজনীতি ছাড়বেন।তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে কাজ করা সম্ভব। পাঁচ বছরে অনেক কিছু বদলানো যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই তরুণ নেতা ও তার অস্বস্তিকর জোট—নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করবে, নাকি বড় শক্তির ছায়ায় মিলিয়ে যাবে তা নির্ধারণ করবে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি