আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব বাণিজ্য ও উপনিবেশিক শাসনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবারও কার্যক্রম বন্ধ করেছে। লন্ডনে বিলাসবহুল খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবনের প্রায় দেড় দশক পর দেউলিয়া হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ইতিহাসের মঞ্চ থেকে সরে গেল ঐতিহাসিক এই নামটি।
১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের রানি রাণী এলিজাভেতের রাজকীয় সনদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় কোম্পানিটি। শুরুতে ভারত থেকে মসলা ও বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তী শতকে এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন, নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও শাসনব্যবস্থায় গভীর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কোম্পানিটি এক বিশেষ অবস্থান তৈরি করে।
১৮৭৪ সালে বিলুপ্তির পর দেড় শতাব্দীর বেশি সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর ২০১০ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় উদ্যোক্তা সঞ্জীব মেহেতা ঐতিহাসিক নামটির স্বত্ব কিনে নেন। তাঁর নেতৃত্বে কোম্পানিটি লন্ডনের মেফেয়ারে একটি বিলাসবহুল লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে। নিউ বন্ড স্ট্রিটের ফ্ল্যাগশিপ স্টোরে প্রিমিয়াম চা, চকলেট, মিষ্টান্ন ও মসলা বিক্রি করা হতো।
মেহতা এই উদ্যোগকে উপনিবেশিক অতীতের এক প্রতীকী পুনর্নির্মাণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন,একজন আধুনিক ভারতীয় ব্যবসায়ীর হাতে উপনিবেশিক নামের নতুন ব্যাখ্যা। তবে খুচরা বাজারের পরিবর্তিত ধারা ও আর্থিক চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে কোম্পানিটি লিকুইডেটর নিয়োগ করে, যখন ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি ঋণ জমা পড়ে। পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার পাউন্ড কর বকেয়া এবং ১ লাখ ৬৩ হাজার পাউন্ড কর্মীদের পাওনা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া নাম সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বিলুপ্ত হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেবল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই ছিল না। উনিশ শতকের শুরুতে তাদের প্রায় আড়াই লাখ সৈন্যের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী ছিল, যা সে সময়কার ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চেয়েও বড়। তবে তাদের শাসন ছিল বিতর্কিত—নগদ ফসল চাষে বাধ্য করা, শোষণমূলক নীতি ও দুর্ভিক্ষ, বিশেষত গ্রেট বেঙ্গল ফেমিন এবং ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের (সিপাহী বিদ্রোহ) মতো ঘটনার সঙ্গে কোম্পানির নাম জড়িয়ে আছে। ওই বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার সরাসরি শাসনভার গ্রহণ করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৭৪ সালে কোম্পানিটিকে বিলুপ্ত করে।
সর্বশেষ এই বন্ধ হয়ে যাওয়া এক ঐতিহাসিক কর্পোরেট নামের নীরব সমাপ্তি নির্দেশ করছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয়, ঐতিহ্যনির্ভর ব্র্যান্ড আধুনিক বাজারে টিকে থাকা কতটা কঠিন এবং উপনিবেশিক অতীতকে ঘিরে স্মৃতির জটিলতা আজও কতটা প্রাসঙ্গিক।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি