রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, আপাতত পরিশোধিত জ্বালানিতে বড় ধরনের সংকট না থাকলেও অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং সরবরাহ নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। এই তেলের বড় অংশ সরবরাহ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। তবে এসব দেশও অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকেই।
বর্তমানে বিপিসির হিসাবে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১১ দিনের, পেট্রলের মজুত ১২ দিনের এবং অকটেনের মজুত প্রায় ২৫ দিনের। জুন মাস পর্যন্ত বিভিন্ন জ্বালানি কেনার চুক্তি সম্পন্ন থাকলেও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিপিসি। কারণ বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে জুন পর্যন্ত দাম নির্ধারিত রয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামার প্রভাব পুরোপুরি পড়ছে না। তবে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনাও এখন তাদের পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির বিষয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টন আসে কাতার থেকে, আর বাকিটা আসে ওমান ও খোলা বাজার থেকে।
তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান–এর হামলার পর কাতার গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে বলে জানা গেছে। এতে শিল্প উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পকারখানায় বয়লার চালাতে গ্যাসের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হয়। যদি জ্বালানি সংকট তৈরি হয়, তবে তা বড় ধরনের দুর্যোগে রূপ নিতে পারে এবং শুধু রফতানি খাত নয়, কৃষি খাতও সমস্যায় পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হলে প্রয়োজনে বেশি দামে হলেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করা জরুরি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্পট মার্কেট থেকেও তেল ও গ্যাস কিনতে হতে পারে এবং উৎস বৈচিত্র্যের দিকে দ্রুত নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে জ্বালানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এলপিজি–র বার্ষিক চাহিদা দেশে প্রায় ১৪ লাখ টন। সেই হিসেবে প্রতি মাসে প্রয়োজন হয় অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি, যার প্রায় পুরোটা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম