আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস তরলীকরণ (এলএনজি) কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে কাতার। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে দেশটি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারকদের অন্যতম কাতারের এই সিদ্ধান্ত সরাসরি সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে। এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি-তে ট্যাংকার চলাচলে বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি পরিবহন হয়।
কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি কাতার এনার্জি গত ৪ মার্চ বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি এবং মেসাইয়িদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে গ্যাস তরলীকরণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
এলএনজি উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসকে প্রায় মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে তরলে রূপান্তর করা হয়, ফলে এর আয়তন প্রায় ৬০০ ভাগের একভাগে নেমে আসে—যা সংরক্ষণ ও পরিবহনকে সহজ করে।
‘ফোর্স মেজর’ কী
‘ফোর্স মেজর’ একটি আইনি ধারা, যার মাধ্যমে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অনাকাঙ্ক্ষিত বড় ধরনের সংকটের কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান দায়মুক্তি পায়।
এই ঘোষণার মাধ্যমে কাতার এনার্জি ক্রেতাদের জানিয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ দিতে পারবে না এবং এজন্য কোনো জরিমানা বা আইনি দায় বহন করতে হবে না।
ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
ভারত: ভারত বছরে প্রায় ২৭ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে, যার প্রায় অর্ধেকই আসে কাতার থেকে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সিটি গ্যাস, সিএনজি ও পাইপলাইনে রান্নার গ্যাস সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আনতে গিয়ে খরচ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ: বাংলাদেশ তার মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৭২ শতাংশ কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নির্ভর করে। সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে দেশে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং হতে পারে এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও বাড়াতে হতে পারে।
পাকিস্তান: পাকিস্তান-এর প্রায় সব এলএনজি আমদানিই আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া, শিল্প খাতে সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিকল্প হিসেবে সৌরশক্তি ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও তা পর্যাপ্ত নাও হতে পারে।
বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব
বিশ্বব্যাপী এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ কাতার সরবরাহ করে। এই উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় ইউরোপ ও এশিয়ায় গ্যাসের দাম ইতোমধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়া, যেখানে কাতারের প্রায় ৮২ শতাংশ এলএনজি রপ্তানি যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য, ইতালি ও বেলজিয়ামের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোকেও বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় উৎপাদকদের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত থাকায় দ্রুত এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কত সময়
প্রাথমিক মেরামত ও নিরাপত্তা যাচাইয়ে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর পূর্ণ উৎপাদন চালু হতে আরও দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সামগ্রিকভাবে এই সংকট এক মাস বা তার বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হবে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে শিল্প খাত পর্যন্ত।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি