যশোর প্রতিনিধি: বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। সময়ের সঙ্গে উদযাপনের ধরনে পরিবর্তন এলেও মানুষের আবেগ ও অংশগ্রহণে এই উৎসব আজও সমান প্রাণবন্ত।
বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রার ইতিহাসে যশোরের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান চারুপীঠের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৫ সালে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে চারুপীঠের উদ্যোগে প্রথম বর্ষবরণ শোভাযাত্রার সূচনা হয়। এর লক্ষ্য ছিল লোকজ সংস্কৃতি ও চারুকলার চর্চাকে জেলা থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া।
চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম বলেন, এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা, যার মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও শিল্পকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। প্রখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতান-এর দর্শন ও প্রেরণায় চারুপীঠ গড়ে ওঠে এবং দীর্ঘ চার দশক ধরে নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি পায়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক জাগরণের অংশ হিসেবে এ শোভাযাত্রা ধীরে ধীরে জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়।
২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে এই আয়োজন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।
বাংলা নববর্ষ এখন শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রবাসেও বাঙালিরা উৎসবটি উদযাপন করে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস ও টাইমস স্কয়ার, যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ব্রিক লেন ও টাওয়ার হ্যামলেটস, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিসহ বিভিন্ন শহরে বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও মধ্য এপ্রিল ঘিরে নতুন বছর উদযাপিত হয় ভিন্ন ভিন্ন নামে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ, আসামে ‘রঙালি বিহু’, পাঞ্জাবে ‘বৈশাখী’, নেপালে ‘বিস্কেট যাত্রা’, থাইল্যান্ডে ‘সংক্রান’ এবং শ্রীলঙ্কায় ‘আলুথ আউরুদু’ নামে উৎসবটি পালিত হয়।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলেও একই সময়ে নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্য রয়েছে। চাকমাদের ‘বিজু’, মারমা ও রাখাইনদের ‘সাংগ্রাই’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’—সম্মিলিতভাবে ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত। ম্রো জনগোষ্ঠী ‘চাংক্রান পোই’ নামে নববর্ষ উদযাপন করে।
দেশের শহর ও গ্রাম—উভয় পরিবেশেই নববর্ষ উদযাপন ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও মূল চেতনা একই। শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট ও বৈশাখী মেলার আয়োজন থাকে। ছায়ানট-এর আয়োজনে রমনা বটমূলে সূর্যোদয়ের সঙ্গে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
অন্যদিকে গ্রামবাংলায় বৈশাখী মেলা, লাঠিখেলা, গ্রামীণ ক্রীড়া ও লোকজ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদযাপিত হয়। ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ খুলে নতুন হিসাব শুরু করেন। খাবারের তালিকায় থাকে পান্তা ভাত, ভর্তা, শুঁটকি ও পিঠাপুলি।
বিদেশি কূটনীতিক, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের কাছেও বাংলা নববর্ষ দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে তারা লাল-সাদা পোশাকে শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেন এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন।
সব মিলিয়ে যশোরের চারুপীঠ থেকে শুরু হওয়া বৈশাখী শোভাযাত্রা আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাঙালির ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি