আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২০২৬ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স (জিটিআই) অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। প্রতিবেদনটি বলছে, ২০২৫ সালে সন্ত্রাসবাদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে পাকিস্তান, যা গত কয়েক বছরে পরিস্থিতির অবনতি নির্দেশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে ১,১৩৯ জন নিহত এবং ১,০৪৫টি সন্ত্রাসী ঘটনার রেকর্ড হয়েছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এ প্রবণতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) তাদের কার্যক্রম বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে তাদের হামলা ২৪ শতাংশ বেড়ে ৫৯৫টিতে পৌঁছায় এবং এতে ৬৩৭ জন নিহত হয়। একই সময়ে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিও একাধিক বড় হামলা চালায়, যার মধ্যে কোয়েটার কাছে যাত্রীবাহী ট্রেন ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
এদিকে, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কও অবনতি হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সীমান্তবর্তী হামলার জেরে পাকিস্তান কার্যত যুদ্ধাবস্থা ঘোষণা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হয়ে জঙ্গি তৎপরতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান
দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এ অঞ্চলে পাকিস্তান শীর্ষে থাকলেও আফগানিস্তান রয়েছে ১১তম স্থানে এবং ভারত ১৩তম স্থানে অবস্থান করছে। তবে ভারতের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে;২০২৫ সালে দেশটিতে সন্ত্রাসী হামলা ৪৩ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ ও নেপাল আরও ভালো অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলা শতভাগ কমেছে এবং নেপালে টানা তৃতীয় বছরের মতো কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।
বিশ্বব্যাপী চিত্র
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিশ্বে সন্ত্রাসে মৃত্যু ২৮ শতাংশ কমে ৭,৭১৪ থেকে ৫,৫৮২-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে হামলার সংখ্যা প্রায় ২২ শতাংশ কমে ২,৯৪৪-এ দাঁড়িয়েছে।
৮১টি দেশের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, যা ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ। বিপরীতে অবনতি হয়েছে মাত্র ১৯টি দেশে। বড় ধরনের গণহত্যামূলক হামলাও কমেছে।
আফ্রিকা ও পশ্চিমা বিশ্বে নতুন ধারা
সাহেল অঞ্চলসহ সাব-সাহারান আফ্রিকায় এখনো সন্ত্রাসবাদের বড় কেন্দ্র রয়ে গেছে, যেখানে বিশ্বব্যাপী অর্ধেকের বেশি মৃত্যু ঘটেছে। তবে সেখানে হামলার ধরনে পরিবর্তন এসেছে,সংখ্যা কমলেও প্রতিটি হামলায় মৃত্যুর হার বেড়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা কম হলেও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হামলা বেড়েছে। একক হামলাকারীর (লোন উলফ) ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে।
শিশু-কিশোরদের ঝুঁকি বাড়ছে
প্রতিবেদনে উদ্বেগজনকভাবে বলা হয়েছে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় সন্ত্রাস-সম্পর্কিত তদন্তের ৪২ শতাংশেই শিশু-কিশোর জড়িত। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুত উগ্রপন্থায় আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কতা
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসে মৃত্যুহার কমলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাময়িক স্বস্তি হতে পারে। পাকিস্তান-আফগানিস্তান উত্তেজনা, আইএস-এর পুনরুত্থান, এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আবারও জটিল করে তুলতে পারে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, “বর্তমান উন্নতি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার সূচনা নাও হতে পারে; বরং অনেক দেশের জন্য এটি সাময়িক স্বস্তি।”
রিপোর্টার্স২৪/এসসি