| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

নিখোঁজের ৪০ বছর পর ভারত থেকে ফিরলেন জাহানারা!

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ০৫, ২০২৬ ইং | ১৪:৩২:৫৭:অপরাহ্ন  |  ১৬৭৩ বার পঠিত
নিখোঁজের ৪০ বছর পর ভারত থেকে ফিরলেন জাহানারা!

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: উঠানের ধুলোমাখা পথটা এখনো আগের মতোই আছে, শুধু মানুষগুলো বদলে গেছে। কেউ বার্ধক্যে নুয়ে পড়েছেন, কেউবা আর নেই। কিন্তু ৪০ বছর আগে যে কিশোরী এই ভিটে থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন, আজ যখন তিনি প্রৌঢ়ত্বের ছায়া নিয়ে সেই চেনা উঠানে পা রাখলেন, তখন সময় যেন আচমকা থমকে দাঁড়াল।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের শাহাপাড়া গ্রামে চার দশক আগে নিখোঁজ হওয়া জাহানারা বেগম (৫৫) ফিরে এসেছেন তাঁর জন্মভিটায়। সঙ্গে তাঁর ছেলে, ৩০ বছর বয়সী মানজিদার সিং। চার দশকের বিচ্ছেদ ঘুচিয়ে এই পুনর্মিলন যেন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।

জাহানারা ছিলেন স্থানীয় মৃত তমিজ উদ্দিনের মেয়ে। পরিবারের ভাষ্যমতে, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে কিশোরী জাহানারা হঠাৎ করেই নিখোঁজ হন। স্বজনদের অভিযোগ, প্রতিবেশী এক আত্মীয়ের প্রলোভনে পড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো হদিস মেলেনি। একপর্যায়ে পরিবার ধরে নিয়েছিল, জাহানারা হয়তো আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই।

কিন্তু নিয়তি তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল সুদূর ভারতের পাঞ্জাবে। সেখানে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করে থিতু হন তিনি। বিয়ে করেন পাঞ্জাবের তাংতারা এলাকায়। বর্তমানে তিনি চার সন্তানের জননী। নাম-পরিচয় বদলে গেলেও হৃদয়ে গেঁথে ছিল বাংলাদেশের সেই সবুজ গ্রাম আর ভাই-বোনদের মুখ।

আজ সোমবার সকালে শাহাপাড়া গ্রামে জাহানারার আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ ভিড় জমায়। বাড়ির উঠানে পা রাখতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ভাইদের বুকে জড়িয়ে ধরে তাঁর সেই আর্তনাদ উপস্থিত কাউকেই স্থির থাকতে দেয়নি।

জাহানারার বড় ভাই আব্দুল কুদ্দুস বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, “আমাদের পাশের বাড়ির এক ভাতিজা ওকে কৌশলে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল। আমরা তখন দিশেহারা হয়ে হন্যে হয়ে খুঁজেছি। আজ এত বছর পর বোনকে ফিরে পেয়ে মনে হচ্ছে, মরা গাছে ফুল ফুটেছে। আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করেছেন।”

আরেক ভাই মোজাম্মেল হক শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, “শৈশবের সেই চঞ্চল মুখটা আজও আমার চোখে ভাসত। ওকে দেখা মাত্রই চিনে ফেলেছি। রক্ত কি আর চেনা যায় না? মনে হচ্ছে হারানো কলিজাটা ফিরে পেলাম।”

জাহানারাকে কখনো দেখেননি এমন অনেক তরুণ-তরুণীও আজ ভিড় করেছিলেন তাঁকে একনজর দেখতে। তাঁর ভাতিজি লাবণী আক্তার বলেন, “দাদি আর আব্বুর মুখে ছোটবেলা থেকে ফুপুর গল্প শুনেছি। রূপকথার মতো লাগত সব। আজ যখন তাঁকে সরাসরি জড়িয়ে ধরলাম, তখন মনে হলো আমাদের পরিবারের অপূর্ণতাটা আজ ঘুচলো।”

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব হাশেম আলী বলেন, “৪০ বছর অনেক লম্বা সময়। এই দীর্ঘ সময়ে কত কিছু পাল্টে গেছে, কিন্তু রক্তের টান যে কতটা শক্তিশালী, আজ জাহানারাকে দেখে তা প্রমাণ হলো। পুরো গ্রাম আজ উৎসবে মেতেছে।”

ফিরে আসা যেমন আনন্দের, বিদায় বলাটা তেমনই কষ্টের। জাহানারার ছেলে মানজিদার সিং ভাঙা ভাঙা ভাষায় জানান, মায়ের মুখে সব সময় এই গ্রামের গল্প শুনে বড় হয়েছেন তিনি। মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতেই তিনি তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।

তবে এই ফেরা স্থায়ী নয়। আজ সোমবার বিকেল পাঁচটার দিকে জাহানারার আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা। সেখান থেকে ফিরে যাবেন ভারতের পাঞ্জাবে, যেখানে তাঁর সাজানো সংসার ও বাকি সন্তানরা অপেক্ষায় আছে। বিদায়ের কথা উঠতেই আবার কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে শাহাপাড়ার আকাশ।

যাওয়ার আগে অশ্রুসিক্ত চোখে জাহানারা শুধু এটুকুই বললেন, “আমি ভাবিনি কোনোদিন এই মাটিতে আবার ফিরে আসতে পারবো। ভাইদের মুখ দেখে মরতে পারব, এটাই ছিল বড় চাওয়া। এখন মরেও শান্তি পাব।”

রিপোর্টার্স২৪/এসএন

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪