| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

হামে শিশুর মৃত্যু: অন্তর্বর্তী সরকার কি জবাবদিহির বাইরে থাকবে

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ০৫, ২০২৬ ইং | ২২:৫৬:৫৩:অপরাহ্ন  |  ৪১৮ বার পঠিত
হামে শিশুর মৃত্যু: অন্তর্বর্তী সরকার কি জবাবদিহির বাইরে থাকবে

রিপোর্টার্স ডেস্ক: দেশে হামের এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৩২ হাজারের বেশি মানুষ রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।

এরমধ্যে স্বনামধন্য বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই মর্মান্তিক তথ্যের কারণ উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ড. ইউনুসের সরকারের টিকা সংগ্রহে অব্যবস্থাপনার কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় নীতিগত পরিবর্তনের কারণে দেশব্যাপী টিকার যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিল, মূলত সেটাই আজকের এই মহামারির আকার ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশু টিকাদানে ঈর্ষণীয় সাফল্যের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়ে আসছিল। ইউনিসেফ এবং ‘গাভি’ (Gavi)-এর সহায়তায় নিয়মিত হাম-রুবেলার (MR) টিকা দেওয়া হতো। কিন্তু ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ সে সময় এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল যে, এর ফলে টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ তা আমলে নেয়নি।

ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ারস জানান, তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এই পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন। নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টিকার সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশজুড়ে রুটিন টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

হামের কারণে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে এখন এক বিশৃঙ্খল ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলো রোগীতে পরিপূর্ণ। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। গত ৭ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতালে কনিকা আক্তার নামের এক মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। ওইদিনই তার ছয় মাস বয়সী যমজ কন্যা রিসা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বর্তমানে তার আরেক কন্যা রুহি একই আইসিইউ বেডে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।

এমন পরিস্থিতি প্রশ্ন উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারকে এই মহামারির কারণে আইনের আওতায় আনার। মঙ্গলবার (৫ মে) জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক মতামতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. নাদিম মাহমুদ প্রশ্ন তুলেছেন যে ‘অন্তর্বর্তী সরকার কি জবাবদিহির বাইরে থাকবে?’

তিনি তার মতামতে লিখেছেন, ‘গত কয়েক মাসে কয়েক শ শিশুর প্রাণহানি কেবল স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। হামের মতো অতিমাত্রায় সংক্রামক রোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চমাত্রার টিকাদান নিশ্চিত করে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তোলা। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় এলে পুরো সমাজের জন্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়, যা সংক্রমণকে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। কিন্তু এই সুরক্ষা বলয় একবার ভেঙে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বাংলাদেশে আজ আমরা সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।

তিনি লিখেছেন, একদিকে শিশুরা মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে চলছে দোষারোপের রাজনীতি। বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দায় চাপিয়েছে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। আবার কোভিডকালীন টিকার ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকার বিষয়টিও সামনে এনেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ কেউ। কিন্তু ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়ার সাক্ষাৎকার অনুযায়ী সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল আগেই ঝুঁকির বিষয়ে অবগত ছিল।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সারা বিশ্ব যখন হামের টিকা দেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তখন আমাদের দেশে কেন হামের মতো অত্যাবশ্যকীয় টিকা সংগ্রহে দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার কথা ভাবা হলো? কোন বিবেচনায় টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ক্রয় উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে নেওয়ার সিদ্ধান্তে আগ্রহী হয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা? এ সিদ্ধান্ত নিলে যে টিকা সংগ্রহে এক বছর দেরি হতে পারে, তা ইউনিসেফের কাছ থেকে জানার পরও কেন তাঁরা এ পথে পা দিয়েছিলেন? জনস্বাস্থ্যের জরুরি চাহিদা ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য বোঝার দায় তো নীতিনির্ধারকদেরই কাঁধে ছিল, তাঁরা কেন ব্যর্থ হয়েছিলেন? অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা। তাঁদের দায়িত্বকাল নিয়ে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্তগত প্রশ্ন গণমাধ্যমে এসেছিল। কিন্তু এসব প্রশ্নের কার্যকর জবাব কখনো পাওয়া যায়নি।

নাদিম লিখেছেন, এখন যখন আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেই টিকা সংগ্রহে বিলম্বের অভিযোগ উঠছে, তখন বিষয়টি আর রাজনৈতিক তর্কের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জনস্বার্থে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তোলে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার নিজের স্বাস্থ্য ভালো ছিল না, এ যুক্তি দেখিয়ে যাঁরা পার পাওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা দয়া করে বলবেন, তাহলে কেন তিনি ওই চেয়ার ধরে বসে ছিলেন? হামে আক্রান্ত হয়ে এই শিশুদের মৃত্যু কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে প্রাণহানি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে। তাই দায়নির্ধারণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ ও বিচার— তিনটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় যাঁরাই জড়িত থাকুক, অন্তত বিএনপি সরকার তো দায়িত্বে ছিল না। তবে এখন যেহেতু দায়িত্ব কাঁধে পড়েছে, তখন নিজেদের স্বচ্ছতার খাতিরে হলেও বর্তমান সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা। সেখানে জাতীয় বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তদন্তে স্পষ্ট করতে হবে, কারা টিকা ক্রয়ে বিলম্ব করেছে, কার সিদ্ধান্তে উন্মুক্ত দরপত্রের বিষয়টি সামনে এসেছে, কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আটকে ছিল এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ বিষয়ে কতটা অবগত ছিল।

এই গবেষক আরো লিখেছেন, শিশুদের মৃত্যু নিয়ে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা না করে এটিকে জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন। যে শিশুর মরদেহ কোলে নিয়ে মা-বাবা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন, সেই শিশুর কোনো অপরাধ ছিল না। রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতা, সিদ্ধান্তহীনতা কিংবা প্রশাসনিক বিলম্বের দায় তার কাঁধে চাপানো যায় না। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর জীবন শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ রক্ষায় ব্যর্থতার দায় কেউ এড়াতে পারে না। হামে শিশুমৃত্যুর এই ট্র্যাজেডির পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটন করা হোক, দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হোক এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বইতে না হয়, সেটিই এখন  জাতির দাবি।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪