| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

এক মাঠে ঘাম, এক মাঠেই বৈষম্য

আমরা নারী বলেই পারিশ্রমিক কম

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ০৬, ২০২৫ ইং | ০৬:০৬:১৫:পূর্বাহ্ন  |  ১৬৪২৭৯৮ বার পঠিত
আমরা নারী বলেই পারিশ্রমিক কম
ছবির ক্যাপশন: কৃষিশ্রমিক আমনের চারা রোপণের ফাঁকে মাঠের এক কোণে পুকুর ঘাটে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন

সাদ্দাম হোসেন, ঠাকুরগাঁও:

ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠে এখন আমন ধানের মৌসুম। সদর উপজেলার ধন্দগাঁও এলাকায় রোববার দুপুরে এক দল কৃষিশ্রমিক আমনের চারা রোপণের ফাঁকে মাঠের এক কোণে পুকুর ঘাটে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। কারও পাতে আলু ভর্তা, কারও বেগুন ভাজি, কারও লাউয়ের ঘন্টু। কেউ আবার ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন ডিমভাজি আর ছোট মাছের ঝোল।

২৫ সদস্যের এই শ্রমিক দলের বেশিরভাগই নারী। সঙ্গে কাজ করছেন পুরুষরাও। কিন্তু সবাই একসঙ্গে মাঠে কাজ করলেও মজুরির অঙ্কে রয়েছে বড় ফারাক। নারী শ্রমিকেরা পাচ্ছেন ৫০০ টাকা, আর একই কাজ করে পুরুষেরা নিচ্ছেন ৭০০ টাকা।

একই রোদে ঘাম, একই কাদায় পা—তবু এই বৈষম্যের কথা বলতেই চোখ ভিজে ওঠে ফুলবানু ও বীনা রানীর। ফুলবানু বলেন, ‘সকালে স্বামী-সন্তানকে রান্না করে খাইয়ে রেখে আমরা মাঠে আসি। সারাদিন ছায়া ছাড়া, পা ডুবিয়ে চারা রোপণ করি। তবু আমাদের মজুরি কম। এটা কি ন্যায্য?’

বীনা রানী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা নারী বলেই পারিশ্রমিক কম, এমনটা কেন চলবে?’

এই শ্রমিক দলের নেতৃত্বে থাকা মঙ্গলু রায়, যাকে সবাই ‘সরদার’ বলে ডাকেন, প্রশ্ন করা হলে সাফ বলেন, “নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করলেও, তারা নারী বলেই তাদের মজুরি কম। এটা আমাদের নিয়ম।”

মঙ্গলুর এই কথার প্রতিবাদে মুখ খোলেননি কেউ, তবে পাশে বসে থাকা মীনা রানী নীরবে চোখ মুছছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ভেসে এল ক্ষতবিক্ষত আত্মার আর্তি—‘নারী হওয়াটাই যেন অভিশাপ।’

শুধু ধন্দগাঁও নয়, ঠাকুরগাঁও জেলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় একই চিত্র। রানীশংকৈল উপজেলার কুমারপুর গ্রামে মাঠে চারা রোপণ করছিলেন মালেকা বেগম। তিনি বলেন, ‘পুরুষদের সমান কাজ করি। কিন্তু মজুরি পাই কম। অনেক সময় না দিলে জায়গা পাই না। মুখ বুজে সব সহ্য করতে হয়।’

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা এলাকার শ্রমিক কল্পনা রানী বলেন, ‘আমরা তো হেঁটে গিয়ে হেঁটে ফিরি। পুরুষেরা অনেক সময় বাইকে আসে। তারপরও তাদের মজুরি বেশি। আর আমাদের চুপ থাকতে হয়।’

শুধু কৃষিক্ষেত্রেই নয়, ঠাকুরগাঁও শহরের রাজাবাদ এলাকার একটি ছোট পোশাক কারখানার শ্রমিক রুমি আক্তার বলেন, ‘আমরা দিনে ১০ ঘণ্টা কাজ করি। পুরুষ কর্মীরা অনেক সময় কম কাজ করলেও তাদের মজুরি আমাদের চেয়ে বেশি।’

একই কারখানার আরেক নারী শ্রমিক শাপলা বেগম বলেন, ‘প্রতিমাসে পুরুষদের ১০-১২ হাজার টাকা মজুরি, আর আমাদের ৮ হাজার। অথচ কাজের চাপ আমাদের ওপরই বেশি।’

এ বিষয়ে কথা বললে ঠাকুরগাঁওয়ের নারী ও শিশু কল্যাণ কর্মী ফারজানা খাতুন বলেন, “নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য মেনে নেওয়া যায় না। সমান কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অধিকার রক্ষা ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব।”

ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে। এই বিশাল এলাকাজুড়ে রোপা আমন লাগানোর কাজে নারীদের অংশগ্রহণ এখন চোখে পড়ার মতো। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে পারিশ্রমিক বৈষম্যের অভিযোগ।

তিনি আরও বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে নারীরা কৃষিশ্রমে আগ্রহ হারাবে। স্থানীয় পর্যায়ে এই বৈষম্য দূর করতে সমবায় পদ্ধতিতে কাজ ভাগাভাগির চিন্তা করা যেতে পারে।”


.

রিপোর্টার্স২৪/এস

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪