আর আই রফিক: আমি শান্ত। একটা মেসে থেকে অনার্সে পড়াশুনা করি। যে বিল্ডিংটায় আমাদের মেস তার অনতিদূরে একটা সরকারি পুকুরে প্রতিদিন গোসল চলে। সকাল ৮টায় আমরা ৬/৭ জন সিনিয়র মিলে সেই পুকুরে যাই। জুনিয়ররা আরো আগে না হয় আরো পরে যায়।
একবার ঈদুল আযহার ছুটিতে সবাই বাড়িতে। আমিও গিয়েছিলাম। তবে ঈদের মাত্র দুদিন পরেই ফিরে এসেছি। ফিরে আসার কারণ----, না থাক্। ওদিকে গিয়ে আর কাজ নেই। মেসে আমরা মাত্র তিনজন। আমিই সিনিয়র। বাকি দুজন একাদশ শ্রণীর। তাই গোসলের বেলায় আমাকে একাই যেতে হয়।
সেদিন গোসল শেষে উঠে কাপড় বদল করছি। এ সময় হঠাৎ রান্না করা একটা মাংসের টুকরার ঢিল এসে পড়লো আমার গায়ে। এর জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তাই বুঝতে পারিনি, ঢিলটা কোত্থেকে এলো। পুকুর পাড়ে একটা দোতলা বাড়ি। প্রাচীর ঘেরা বাড়িটার দোতলায় একটা কক্ষের জানালা খোলা। এছাড়া আশপাশে কোন বাড়ি নেই। তাই খেয়াল ওদিকেই। পড়নের ভেজা লুঙ্গী ধুয়ে নিয়ে পাড়ে উঠছি, ঠিক ঐ মুহূর্তে আরেকটা টুকরা এসে আমার মাথায় লাগার উপক্রম। আমি নুয়ে পড়ায় লাগেনি। এবার কিন্তু নিক্ষেপকারীও ধরা পড়ে গেল। মাত্র ১০/১৫ হাত দূর থেকে জানালা দিয়ে ঢিলটা ছুড়ে আড়ালে চলে যাওয়ার সময় আমি দেখে ফেললাম। গোলাপি রংয়ের পোশাক পড়া একটি মেয়ে কাজটি করেই সরে যাচ্ছে। বয়সের দোষেই হয়ে থাকবে, বিষয়টা আমার কাছে মন্দ লাগেনি। বরং একটা দক্ষিণা বায়ু হৃদয়ে দোলা দিয়ে গেল। এতে বিকেলে একরকম মদমত্তের মত একা একাই ওদিকের রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম।
এবার মেয়েটিকে স্পষ্টই দেখতে পেলাম। এক অপরূপা অষ্টাদশী। চার চোখের মিলনও হলো। ইচ্ছা থাকা সত্বেও দাঁড়াতে পারিনি। বাড়িটা অতিক্রম করে চলে যেতে হলো। উদ্দেশ্য যেহেতু সফল, তাই ফিরতেও দেরী করিনি। ফেরার পথে প্রাচীরের আড়াল থেকে ইটের টুকরার সাথে বাঁধা একটা কাগজ আমার সামনে রাস্তার উপর এসে পড়ল। সেটা হাতে করে রুমে চলে এলাম। খুলে দেখলাম, একটা মোবাইল নম্বর লেখা। নীচে ছোট্ট অনুরোধ--প্লীজ, এ নম্বরে একটা মিসকল দিবেন। আপনার সাথে কথা আছে।
আর দেরী সইলো না। কল করলাম। ওপাশ কেটে দিয়ে ব্যাক করল। অনেকক্ষণ কথা হলো। জানলাম, ওর নাম তৃণা।
এরপরেতো সচরাচর যা হয়, তা-ই। মেসের সবাই ফিরেও এলো একসময়। তবে তৃণার সাথে আমার সাক্ষাতে বিঘ্ন নেই। শহরের বিভিন্ন স্থানে দেখা করে কথা হয়। যতটুকু ধারণা করতে পারলাম, তাতে তৃণা একটা সহজ-সরল এবং স্বল্পভাষী মেয়ে। সাজিয়ে কথা বলার ক্ষমতা কম। ওর চোখের ভাষায় মনের পাতাটা পড়ে নিতে হয়।
একদিন পার্কে গিয়ে দুজনে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছি। তৃণার যেন ভয়ের অন্ত নেই। পরিচিত কেউ দেখে ফেলবে। এদিক ওদিক তাকিয়েই সময় যাচ্ছে ওর। জিজ্ঞেস করলাম-- তুমি এমন করছো কেন ?
তৃণা উত্তর দিল-- আমি বলে এসেছি, আধা ঘন্টার মধ্যেই এসে পড়বো। এখন দেড় ঘন্টা হয়ে গেছে। মা যদি কাউকে খুঁজতে পাঠায় ?
বললাম-- ও, এই কথা। কে খুঁজতে আসবে? তোমার ভাইতো ছোট। তাহলে আর কে আসবে ?
-- এই সময় বাবা লাঞ্চ করতে আসেন। তাকেই যদি পাঠায় ?
অভয় দিয়ে বললাম-- আরে না, তাঁর সময়ের মূল্য আছে। এখানে সময় নষ্ট করতে আসবেন না।
(তৃণার বাবাকে আমি দেখিনি। তবে ওর মুখেই শুনেছি, তিনি একটা সরকারি ব্যাংকে পিওন পোস্টে চাকরি করেন)
তৃণা বলে উঠল-- ঝর্ণাকেওতো (ওর ছোট বোন) পাঠাতে পারে।
জিজ্ঞেস করলাম-- ওর কি স্কুল নেই ?
--ওতো SSC পরীক্ষার্থী। কোচিং ক্লাস করে আগে বাগেই চলে আসে।
মশকারির সাথে বললাম -- সে এলেতো আরো ভালো হবে। দুবোনের সাথে একসঙ্গে প্রেম করা যাবে।
জবাবে তৃণা শুধু " উঁম" উচ্চারণ করলো ? বুঝতে পারলাম, কি বলে এর উচিৎ জবাব দেয়া যায়, সেটা তৈরী করতে পারছে না। তাই আবার বললাম-- কি বল ? আমরা আরেকটু অপেক্ষা করি, ঝর্ণাও আসুক, না কি ?
তৃণা এবার বলতে পারল-- ও চালাক মেয়ে। তোমাকে বিক্রি করে চলে যাবে, তুমি টেরও পাবে না।
বললাম -- তাহলেতো পাক্কা মেয়ে।
তৃণা-- হুঁ।
-- তুমিই একটু বোকা টাইপের, তাইনা ?
তৃণা-- বোকাই ভালো। এত চালাক ভালো না।
বললাম-- বোকা হলেও ঢিল ছুড়ে মানুষ শিকার করতে কিন্তু দারুণ দক্ষ।
তৃণা-- যাও।
-- কেন, মিথ্যে বললাম নাকি ?
তৃণা এবার নিজের সাফাই গাইতে পারলো। বলল-- আমি হাড়ের টুকরাটা রাস্তায় ছুড়ে ফেলতে চাইছিলাম। সেটা গিয়ে তোমার গায়ে লেগেছে।
বললাম-- তাহলে পরেরটা ?
এবার আর কোন সদুত্তর বেরুচ্ছে না দেখে ওর দিকে তাকাইলাম। বাহ্, লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে গেছে বেচারি। ওর লজ্জা ভাঙাতে ওর হাতটা চেপে ধরে বললাম -- এত লজ্জা কেন ? তুমি ঢিল না ছুড়লে আমিওতো তোমাকে কাছে পেতাম না। এ আমার ভাগ্য।
দেখলাম, তৃণা খুশী হয়েছে এবং আমার হাটুতে তার লাজুক মুখখানা লুকিয়ে নিচ্ছে। কিছু বলতে পারছে না।
প্রায় আট মাসের মত আমাদের প্রণয় চলল। যতবার দেখা হয়েছে, আমি বক্তা, ও শ্রোতা। মাঝে মধ্যে হা/না উত্তর। বড়জোর এক-দুই বাক্যের কথা। একদৃষ্টে তাকালে ওর ফর্সা লম্বা দেহটা লজ্জায় গোলাপী লাল হয়ে যায়।
এর মাঝে একদিন আমার এক বন্ধুর কাছে জানতে পারলাম, তৃণা ডিভোর্সী। বছর দুই আগে ওর বিয়ে হয়েছিল এবং তিন মাসের মত ঘর-সংসার করে প্রবাসী স্বামী ওকে ডিভোর্স দিয়ে আবার প্রবাসেই চলে গেছে।
কথাটা আমার মাথায় বজ্রপাতের মতই মনে হলো। সেদিনই তৃণাকে ফোন করে বিষয়টার সত্যতা জানতে চাইলাম। তৃণা প্রথমে কিছুই বলতে পারেনি। পরে ওর ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলে আবার জিজ্ঞেস করলাম-- তাহলে কি কথাটা সত্য ?
তৃণা একটু নীরব থেকে বলল-- হ্যা।
-- তাহলে সেটা আমাকে আগে জানাওনি কেন ?
আরো কতক্ষণ চুপ থেকে তৃণা আমতা আমতা শুরু করল।
এতে আমিই আবার বললাম -- আমাকে আর কোনদিন ফোন করবে না।
ওপাশ কি যেন বলতে চাইছিল। সেসবের তোয়াক্কা না করে সংযোগ কেটে দিলাম।
রাতে আরেকবার তৃণার কল পেয়ে রিসিভ না করেই কেটে দিলাম এবং ক্ষোভে সীম কার্ডটাই বন্ধ করে দিলাম। এমনকি পুকুরে আর গোসলও করতে যাই না। ৩/৪ দিন পরে এক বিকেলে দেখলাম তৃণা ৮/৯ বছরের একটি মেয়েকে সাথে করে আমাদের মেসের নীচতলার বারান্দায় কাকে যেন খুঁজে চলছে। আমার রুমটা ছিল দোতলায়। সেখান থেকেই ওদের দেখতে পেলাম। তবে নীচে নেমে দেখা করার প্রয়োজন মনে করিনি।
যাক্, তৃণার সাথে আর দেখা নেই। আমি অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে বেসরকারি হাইস্কুলে একটা চাকরি নিয়েছি। স্কুলটা বাড়ি থেকে প্রায় ৭০ কিলো দূরে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। চাকরির বাজারের কথা চিন্তা করে একেই গ্রহণ করতে হলো।
চাকরি নেয়ার সময়েই বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির কয়েকজন সদস্যের সাথে কথা। দুরত্বের বিষয়টায় একজন সদস্য আশ্বাস দিলেন, তাঁর বাড়িতে থেকেই আমি শিক্ষকতা করতে পারবো। কোন সমস্যা হবে না।
সেটাই হলো। সদস্য হাজী হেলাল সাহেবের বাড়িতে থেকেই আমি শিক্ষকতা করছি। গ্রামের বাড়ি। বাহির আঙ্গিনার বৈঠকখানায় আমার থাকার ব্যবস্থা। খাবারও সময় হলে এখানেই চলে আসে। ৮/৯ বছরের কাজের মেয়ে শাহানা দিয়ে যায়। খাবার দেখে, কেমন যেন একটা অতিরিক্ত যত্নের লক্ষ্মণ অনুভূত হয়। প্রতিবারেই এমন কিছু নতুন আইটেম পাই, যা নিশ্চয়ই সকলের জন্য করা হয়নি। বিষয়টি পরিবেশনার দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়।
একদিনের কথা বলছি। সেদিন খাসীর মাংস আর ডাল দিয়ে খাওয়া। তবু সাথে একটা ডিমের মামলেট। দেখে শাহানাকে জিজ্ঞেস করলাম-- ডিমও কি আজ সবার জন্য করা হয়েছে ?
শাহানা নিঃসঙ্কোচে উত্তর দিল -- না ছার, আপনার জন্যই দাদু ডিম ভাইজ্যা দিছে।
-- তুমি খেয়েছ ?
-- না, সবে খায়্যা সারলে আমি আর দাদু খাইবাম।
শুনে ভালো লাগল। জিজ্ঞেস করলাম-- তোমার দাদু তোমাকে আদর করেন, তাই না ?
শাহানা মাথা ঝাকিয়ে হা সূচক জবাব দিয়ে মুখে গর্বের সাথে বলে উঠল-- দাদু খুব ভালা মানুষ। সবেই দাদুর লাগ্যা পাগল।
বললাম-- তুমি ছাড়া বাকি সবাই তোমার দাদুর জন্য পাগল, ঠিক না ?
শুনে শাহানা হেসে উঠল। বলল-- আমি দাদুকে ছাড়া থাকতেই পারি না।
-- আচ্ছা বেশ।
ওকে আরো কিছু প্রশ্ন করে হেলাল সাহেবের পারিবারিক সব তথ্যই আমার জানার মধ্যে নিয়ে এলাম। বয়সে পঞ্চাশের কাছাকাছি হেলাল সাহেবের আগের স্ত্রী তিন ছেলে আর এক মেয়ে রেখে মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। পরে তিনি দ্বিতীয় সংসার করেছেন।
শাহানার কাছেই শুনলাম, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী শহরের মেয়ে এবং খুবই ভালো। আগের সন্তানেরা তাঁকে পেয়ে যেন মৃতা মাকেই ফিরে পেয়েছে। তাঁকে আমি দেখিনি, তবে শাহানার কথায় বুঝতে পারি, মহিলা সর্বগুণে গুণান্বিতা।
সেদিন স্কুলে যাওয়ার সময় মনে হলো কাপড়গুলো ময়লা হয়ে গেছে। বিকেলে ধুয়ে দেবো। কিন্তু স্কুল থেকে ফিরে দেখি, আমার কাপড় একটাও ঘরে নেই। ভাবছি, এগুলো আবার গেল কোথায় ? এর মাঝেই শাহানা সমস্ত কাপড় নিয়ে এসে বলল-- দাদু সবগুলাইন ধুইয়া দিছে।
একটা শার্ট দেখিয়ে আরো বলল-- এইডা অহনো হুকায় নাই। লাইড়া দিবার কইছে।
শুনে মহিলার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। শাহানার কাছ থেকে কাপড়গুলো নিতে নিতে দেখলাম, খুব পরিষ্কার হয়েছে ওগুলো। যেগুলোতে নীল দেয়ার দরকার, নীলও দেয়া হয়েছে। মনে মনে মহিলাকে হাজার বার ধন্যবাদ দিলাম। সত্যি কথা বলতে, আমার অন্তরে মহিলাকে ৩৫/৪০ বছরের অনুমান করে একটা ছবিও ফুটে উঠছিল বার বার এবং ভাবছিলাম, যদি কখনো দেখা হয় "আপু" সম্বোধনে বড়বোন বানিয়ে নেবো।
যাক্, সেদিন হেলাল সাহেবের শ্বশুর (দ্বিতীয় পক্ষের) বেড়াতে এসেছেন। রাতে খাওয়ার সময় হেলাল সাহেব আমাকেও বাড়ির ভিতরেই ডেকে নিলেন। এক সাথেই ডাইনিং টেবিলে বসেছি। দেখলাম, দুই শ্বশুর-জামাতা প্রায় সমবয়সী হওয়ায় তাদের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটাই বন্ধুসুলভ।
টেবিলে খাবার সাজানো আছে। নিজেরাই নিয়ে নিয়ে খাচ্ছি। একসময় হেলাল সাহেব ডেকে উঠলেন -- আচারের বাটি কই?
পাশের কক্ষ থেকে মহিলা কণ্ঠে শাহানাকে ডাকতে শুনা গেল। কণ্ঠটা আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। কিন্তু কে, সেটা নির্ণয় করতে পারছি না।
এসময় হেলাল সাহেব বলে উঠলেন -- তুমিই দিয়ে যাও না। মাস্টার সাহেবতো এখন আমাদের পরিবারেরই মানুষ।
এসময় মহিলা নিজেই আচারের বাটি নিয়ে এসে টেবিলে রাখছেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে আমি যেন আড়ষ্ট হয়ে গেছি। আরে এযে তৃণা ! এমন ফুলের মত সুন্দর মেয়েটার কিনা বিয়ে হলো বাবার বয়সী একজন বয়স্ক মানুষের সাথে ! আমি খাওয়া রেখে অতীত নিয়ে ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। তৃণাও ওকক্ষে চলে গেছে।
হেলাল সাহেব বলে উঠলেন -- কী হলো মাস্টার সাহেব ? খাচ্ছেন না যে ?
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আবার খেতে খেতে বললাম - না, খাচ্ছি তো।
আমার বুঝতে দেরী হলো না যে তৃণা আমাকে প্রথম দিনেই চিনতে পেরেছে। ঐ মুহূর্তে ওর প্রতি যে অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে, সেটা লিখে বুঝানো যাবে না।
সেদিন থেকে কেন জানি না, তৃণার কাছে নিজেকে খুবই হেয় মনে হয়। ওর পরিবেশিত খাবারগুলো আমাকে ধিক্কার দেয়। ওর পরিষ্কার করে দেয়া কাপড়গুলো আমাকে বলে, তুমি সুশিক্ষিত হতে পারোনি। পুঁথিগত বিদ্যা তোমার অন্তরে প্রশস্থতা আনতে পারেনি। তুমি স্বার্থপর ইত্যাদি, ইত্যাদি।
কবি ও উপন্যাসিক
রিপোর্টার্স২৪/সোহাগ