| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ডোনাল্ড ট্রাম্প, অ্যালবিনো মহিষ এবং অবদমিত মনস্তত্ত্ব: ক্ষমতার ছায়াযুদ্ধ ও সার্কাসের রাজনীতি

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ৩১, ২০২৬ ইং | ০০:০৯:৩২:পূর্বাহ্ন  |  ৫৩০ বার পঠিত
ডোনাল্ড ট্রাম্প, অ্যালবিনো মহিষ এবং অবদমিত মনস্তত্ত্ব: ক্ষমতার ছায়াযুদ্ধ ও সার্কাসের রাজনীতি

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ:

কোরবানির পশুকে ঘিরে আমাদের দেশের হাটে-ঘাটে নানাবিধ চটকদার নামকরণের সংস্কৃতি নতুন নয়। কিন্তু অতি সম্প্রতি একটি অ্যালবিনো জাতের মহিষের নাম আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাখা এবং তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মাদনা—আমাদের সমষ্টিগত অবচেতন মনের গভীর ও কুৎসিত মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতকে সামনে এনেছে।

​আমাদের সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অক্ষমতা প্রকাশের একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে: “তোর নামে কুত্তা পুষবো!” যখন কোনো মানুষ অন্য কারও শক্তির সমকক্ষ হতে পারে না, ক্ষমতার ভারসাম্য যেখানে যোজন যোজন দূরত্বে অবস্থান করে, তখন দুর্বল পক্ষ এই ধরনের প্রতীকী অবমাননার আশ্রয় নেয়। একটি মহিষের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ রাখা ঠিক এই আদিম, অবদমিত এবং বিকৃত মনস্তত্ত্বেরই এক আধুনিক নাগরিক সংস্করণ।

​১. অক্ষমের অবদমিত ক্ষোভ ও প্রতীকী আধিপত্যের প্রাচীন ইতিহাস

​মানুষ যখন কারও শক্তি, ক্ষমতা বা বৈশ্বিক অবস্থানের ধারেকাছে গিয়ে তার কোনো ক্ষতি করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে প্রতীকী উপায়ে তাকে নিজের আয়ত্তে বা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা চলে ‘প্রতীকী আধিপত্য’ (Symbolic Dominance)।

​ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীনকালে যখন কোনো উপজাতি বা দুর্বল গোষ্ঠী কোনো শক্তিশালী সামন্তপ্রভু বা রাজাকে পরাস্ত করতে পারত না, তখন তারা সেই রাজার কুশপুত্তলিকা বানিয়ে কিংবা কোনো পশুকে সেই শাসকের নাম দিয়ে জনসম্মুখে নির্যাতন করত। অবচেতন মনে তারা বিশ্বাস করত, পশুর গলায় রশি পরানোর মানে হলো পরোক্ষভাবে ওই অধরা শক্তিশালী সত্তার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা বিশ্বরাজনীতির মোড়লদের নেওয়া কোনো নীতি যখন তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনে পরোক্ষ দুর্ভোগ ডেকে আনে, তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে হোয়াইট হাউজের দরজায় গিয়ে প্রতিবাদ করা অসম্ভব। ফলে, ঘরের কাছের গরুর হাটে একটি মহিষের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ রেখে, সেটিকে রশি দিয়ে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে একশ্রেণির মানুষ একধরনের আদিম ও ক্ষণস্থায়ী মানসিক তৃপ্তি খোঁজে। এটি আসলে ক্ষমতার বৈশ্বিক লড়াইয়ে হেরে যাওয়া অবদমিত মানুষের এক দেউলিয়া ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’।

​২. শোষকের নাম বনাম পুঁজিপতিদের সার্কাস

​এই নামকরণের নেপথ্যে খামারি বা ব্যবসায়ীদের একধরনের চতুর ও নগ্ন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকে। কোরবানির পশুর হাটে পণ্যের ‘হাইপ’ বা কৃত্রিম আলোড়ন তোলার জন্য তারা এই ধরনের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম জুড়ে দেয়। এটি মূলত পুঁজিতান্ত্রিক বিপণন কৌশলের এক কুৎসিত রূপান্তর, যেখানে একটি প্রাণীকে স্রেফ চড়া দামে বিক্রি করার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির নামকে ‘মেমে’ (Meme) বা তামাশায় পরিণত করা হয়। আর আমাদের হুজুগে মধ্যবিত্ত সমাজ সেই উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ দেখে হাততালি দেয়, আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। অথচ তারা ভুলে যায়, দিনশেষে তারা নিজেরাও এই পুঁজির বাজারেরই এক একজন অসহায় ভোক্তা মাত্র।

​৩. রাজনীতির নতুন ন্যারেটিভ: বড় অপরাধ ঢাকতে ‘দৃষ্টি আকর্ষণ বিচ্যুতি’

​সবচেয়ে ভীতিজনক এবং গভীর সত্যটি লুকিয়ে আছে সমকালীন রাজনীতির নেপথ্যে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে একটি বহুল ব্যবহৃত তত্ত্ব হলো ‘দৃষ্টি আকর্ষণ বিচ্যুতি’ (Mass Distraction)। সমাজে যখন বড় বড় অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি, পদ্ধতিগত দুর্নীতি, মেগা লুটপাট কিংবা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের মতো সংবেদনশীল ঘটনা ঘটে, তখন সমাজমনস্কতাকে শান্ত বা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে একধরনের ‘পপ-কালচার সার্কাস’ বা চটকদার বিনোদনের জন্ম দেওয়া হয়।

রোমান সাম্রাজ্যের শাসকরা বলতেন, “জনগণকে যদি রুটি আর সার্কাস (Bread and Circuses) দিয়ে ভুলিয়ে রাখা যায়, তবে তারা কখনোই রাজার অধিকার বা সাম্রাজ্যের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না।” ​এই অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ হলো আমাদের বর্তমান সময়ের সেই আধুনিক সার্কাস। যখন দেশের সাধারণ মানুষ বাজারের আগুনমূল্যে কোরবানি দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, যখন ব্যাংকিং খাতের চরম নৈরাজ্য কিংবা নীতিগত ব্যর্থতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়ার কথা—ঠিক তখন পুরো জাতির চোখের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো একটি গোলাপি মহিষের নাম ও তার কোটি টাকার গল্প! মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম মিলে মানুষের চোখের ওপর এমন এক রঙিন পর্দা পরিয়ে দেয়, যার ফলে আমজনতা আসল শোষকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা ভুলে গিয়ে একটি নিরীহ প্রাণীর নামকরণের সস্তা এবং নোংরা খেলায় মেতে ওঠে।

যে সমাজ বাস্তব জীবনে নিজের অধিকার আদায় করতে পারে না, যে সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার নূন্যতম সাহস হারিয়ে ফেলেছে, সেই সমাজই কেবল পারে একটা পশুকে মানুষের নাম দিয়ে খাঁচায় বন্দি করে বীরত্ব প্রকাশ করতে। এটি কোনো শক্তির লক্ষণ নয়, বরং এটি চরম কাপুরুষতা এবং সমষ্টিগত মনস্তাত্ত্বিক পঙ্গুত্বের বহিঃপ্রকাশ।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নামক মহিষটি আমেরিকার ক্ষমতাধর নেতাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না; বরং তা আমাদের সমাজের সেই নগ্ন সত্যকে উন্মোচন করে দেয়—যেখানে আমরা আসল শোষকের মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পেয়ে, শোষকের নামের একটা পশুকে হাটে তুলে ক্ষোভের সস্তা উপশম খুঁজি। আর এই সুযোগে নেপথ্যের আসল কুশীলবরা আমাদের চোখের ওপর অন্ধকারের পর্দা আরও গাঢ় করে টেনে দেয়।

লেখক: কবি ও সম্পাদক (কবিয়াল)

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪