স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে পুলিশ কনস্টেবল শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে। ওই পুলিশ সদস্য ময়মনসিংহ রেঞ্জে কর্মরত ছিলেন। নিজের নিরাপত্তা ও পুলিশ সদস্যের বিচার চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপি কমপ্লেইন সেলে গত ২১ আগস্ট লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী শিক্ষানবিশ আইনজীবী। এছাড়া পাশাপাশি অভিযুক্ত শামীমের বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় মামলাও দায়ের করেছেন তিনি। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
ভুক্তভোগীর ইউনিভার্সিটির বন্ধু রাজুর মাধ্যমে শামীমের সঙ্গে তার পরিচয় হয় জানিয়ে পুলিশ সদরদপ্তরে করা অভিযোগে বলা হয়, পরবর্তীতে অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি আমার বন্ধুর কাছ থেকে আমার মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে। নিজেকে অবিবাহিত দাবি করে আমাকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে। বিভিন্ন সময় কথা বলে এবং দেখা করে প্রেমের সম্পর্ক করতে প্রলুব্ধ করে। আমি তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। তখন সে আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে ২০২৩ সালের ১০ নভেম্বর রাত আনুমানিক ৮টায় সময়ে অভিযুক্ত কনস্টেবল শামীম আহমেদ আমাকে রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন নিকুঞ্জ-২ এর বাসা নং-৩, রোড নং-১৩ তার নিজ বাসায় নিয়ে যায়। এরপর কোল্ড ড্রিংকসের মধ্যে আমার অজান্তে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে আমাকে খাওয়ায়। এতে আমি অচেতন হয়ে পড়লে আমাকে ধর্ষন করে শামীম। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখে শামীম আহমেদকে জিজ্ঞেস করি ‘আমার সঙ্গে তুমি এমন কাজ কেন করলে’, তখন সে আমাকে বলে ‘কিছুদিনের মধ্যে আমরা বিয়ে করে ফেলব, আমাকে ক্ষমা করে দিও, নিজেকে সামলাতে পারিনি’।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে সে বিভিন্ন সময়ে আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রæতি দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট আমাকে ধর্ষণ করলে আমি তাকে বিয়ে করার জন্য জোর-জবরদস্তি করি। তখন সে আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য ৩০০ ফিট নামক স্থানে বাইকে চড়িয়ে ঘুরতে নিয়ে যায়। তখন আমি তাকে আবারও বিয়ে করার কথা বললে সে আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চলন্ত মোটর সাইকেল থেকে ফেলে দিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে। আমি ১০ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। আমার মাথার ডানপাশে কাঁটাছেড়া গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়।
অভিযোগে বলা হয়, কনস্টেবল শামীম আহমেদ মামলার হাত থেকে বাঁচার জন্য আবারো আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। পুনরায় সে আমাকে বিয়ে করার কথা বলে সর্বশেষ চলতি বছরের গত ৬ মে দুপুরে খিলক্ষেতে তার বাসায় যেতে বলে। আমি তার কথা বিশ্বাস করে তার ভাড়া ফ্ল্যাট বাসায় গেলে সে আমাকে ফ্ল্যাটে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে ঝাপটে ধরে। তখন আমি বাঁধা দিয়ে বলি ‘অনেক হয়েছে আর না। বিয়ে ছাড়া আমি কোনো সম্পর্কে লিপ্ত হবো না’। সে ধর্ষণে বাঁধা প্রাপ্ত হইয়া রান্নাঘর থেকে ধারালো ছুরি নিয়ে চুলায় গরম করে এনে আমার নাভির উপরে পেটের ডানপাশে ছ্যাকা দিয়ে আমাকে গুরুতর জখম করে। আমি অচেতন হয়ে পড়লে ওইদিন দুপুরে আমাকে আবার ধর্ষণ করে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ধর্ষণের আলামত ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে খিলক্ষেত থানার পুলিশের সহযোগীতায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলায় আমাকে জেলে পাঠায়। আমি আইনি সহায়তা না পেয়ে দীর্ঘ ৯ দিন পর জামিনে মুক্ত হই। জেলখানায় থাকা অবস্থায় আমি আমার ক্ষত স্থানের চিকিৎসা গ্রহন করি। পরবর্তীতে আমি খিলক্ষেত থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ মামলা গ্রহন করেনি।
এরপর এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গত ২৭ মে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ এ মামলা করেন। পরে আদালত খিলক্ষেত থানাকে এজাহার গ্রহণের নির্দেশ দেন।
অভিযোগে বলা হয়, আসামী আমাকে পুলিশের চাকুরীর ভয় দেখিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। সম্প্রতি সে তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার থেকে আমাকে কল দিয়ে গুম ও খুন করে ফেলার হুমকি দেয়। আমি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় জীবন-যাপন করছি। আসামি যেকোন সময় আমার বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। আমার বাবা জীবিত নেই, আমি এতিম।
ভুক্তভোগী তরুণী ‘রিপোর্টার্স-২৪’কে বলেন, সম্প্রতি আমার বড় ভাইয়ের উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার বাসায় গিয়ে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয়। আমাকে রাস্তায় ফেলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পাশাপাশি বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে আসছে। কনস্টেবল শামীম নিজেকে অবিবাহিত দাবি করলেও পরে জানতে পারি তার স্ত্রী সন্তান রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী। আমার কাছে শামীম নিজেকে পুলিশ অফিসার পরিচয় দিতো।
বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলক্ষেত থানার এসআই মো. শামীম হক ‘রিপোর্টার্স-২৪’কে বলেন, ‘ঘটনার পর কনস্টেবল শামীম সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। শামীম ময়মনসিংহ রেঞ্জে পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ পুলিশ ফুটবল দলের একজন খেলোয়ার ছিলেন। তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন; তা জানা নেই। মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।’
বৃহস্পতিবার বিকেলে অভিযুক্ত কনস্টেবল শামীমের ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল ফোন নাম্বারে কল দিলে রিসিভ না করে বরং কেটে দেয়া হয়। পরবর্তীতে তার ব্যবহৃত একটি নাম্বার থেকে প্রতিবেদককে এক ব্যক্তি কল দিয়ে জানান, তিনি শামীমের বড় ভাই শহীদ। শামীম বর্তমানে অসুস্থ হয়ে একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শামীমের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর বেশ কয়েকবার কল দিলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।
রিপোর্টার্স ২৪ /এসএন