আসাদুজ্জামান সম্রাট
বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে বিস্তৃত এক মহীরুহ—সুন্দরবন। প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এ ম্যানগ্রোভ অরণ্য শুধু বাংলাদেশের গর্ব নয়, গোটা পৃথিবীর এক অমূল্য সম্পদ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের অর্ধেকই রয়েছে বাংলাদেশে। আর এ বনকে ঘিরেই বেঁচে আছেন উপকূলের চার কোটির বেশি মানুষ। যে সমুদ্র প্রতিদিন অগ্রসর হচ্ছে ভূমির দিকে, সেই সমুদ্রের ঢেউ ও ঝড়-ঝঞ্ঝার বিরুদ্ধে প্রকৃতির তৈরি ঢাল সুন্দরবন। কিন্তু আজ সেই সবুজ প্রাচীর ভেঙে পড়ছে, আর এই ভাঙনের শব্দ শুধু গাছের নয়, মানুষেরও অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সুন্দরবন ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের অনন্য উদাহরণ। ১৮৭৬ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে যখন প্রায় দুই লাখ মানুষ মারা যায়, তখন থেকেই বুঝে নেওয়া যায়—প্রকৃতি যদি ক্রুদ্ধ হয়, মানুষের বাঁচার আর কোনো উপায় থাকে না। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ নিহত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোটি মানুষ। অথচ গবেষণা বলছে, সুন্দরবনের বিস্তৃত গাছপালা সেই ঝড়ের ধাক্কা অনেকটাই শুষে নিয়েছিল। বন না থাকলে মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা আরও বহুগুণে বাড়ত। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে—আর কতদিন এই বন তার শক্তি ধরে রাখতে পারবে?
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখানে সবচেয়ে প্রকট। সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রতিবছর গড়ে ৩.৭ মিলিমিটার হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের আন্তঃসরকারি জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (IPCC)। এই হারে চলতে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলের ১৭ শতাংশ অংশ পানির নিচে চলে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, এক মিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের সুন্দরবনের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা ডুবে যাবে। খুলনার পরিবেশবিদেরা বলছেন, “আমাদের হাতে সময় আর বেশি নেই। এখন যা ঘটছে, তা আগামী ক’দশক নয়, আজকের প্রজন্মের জীবনেই ধরা দেবে।”
লবণাক্ততা বৃদ্ধি সুন্দরবনের মাটিকে অদ্ভুতভাবে পরিবর্তন করছে। আগে যেখানে সুন্দরী গাছের ঘন জঙ্গল দেখা যেত, সেখানে এখন লোনা-সহনশীল গরান বা গেওয়া দ্রুত ছড়াচ্ছে। একসময়কার মিষ্টি জলের প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে গোটা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে, শুশুক আর ডলফিন দিশেহারা। স্থানীয় মধু সংগ্রাহকরা জানান, মৌমাছিরা আগের মতো চাক বসাচ্ছে না। “জঙ্গলে যাই, মধু মেলে না,” বললেন সাতক্ষীরার আশরাফ আলী, যিনি ত্রিশ বছর ধরে মধু সংগ্রহ করছেন।
ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন এখনও স্পষ্ট। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছিলেন। বহু গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে লোনা পানিতে ডুবে ছিল। আম্পান কিংবা রেমালের মতো সাম্প্রতিক ঝড়ে ভেঙেছে নতুন করে বাঁধ, ভেসে গেছে চাষের জমি। উপকূলের মানুষ প্রায়ই বলেন, “আমাদের জীবনটাই যেন এখন বাঁধের দয়ায়।” অথচ বাঁধগুলোও খুব টেকসই নয়, বারবার ভেঙে যাচ্ছে।
সুন্দরবনের প্রতীক বাঘ আজ সবচেয়ে বিপন্ন। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশ অংশে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১১৪। কিন্তু আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে বারবার বলা হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ মাত্র কয়েক দশকে ২৮ সেন্টিমিটার বাড়লেই বাঘের আবাসভূমি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বাঘ নেই মানে শুধু একটি প্রাণীর বিলুপ্তি নয়, গোটা খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়া। বাঘ না থাকলে হরিণের সংখ্যা বাড়বে, চারণভূমি ধ্বংস হবে, আর বন তার ভারসাম্য হারাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতিরোধে সরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-তে সুন্দরবনকে জাতীয় অগ্রাধিকারে রেখেছে। লক্ষ লক্ষ ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করা হচ্ছে, নদী ও খালে খনন কাজ চলছে, বিকল্প জীবিকা কর্মসূচি চালু হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তা ও আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আগের তুলনায় বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, আজ থেকে ৩০ বছর আগে যেকোনো ঘূর্ণিঝড়ে যেখানে হাজার হাজার মানুষ মারা যেত, এখন একই মাত্রার ঝড়ে প্রাণহানি কয়েকশতে সীমিত থাকে। কিন্তু বনবিদরা মনে করছেন, “ঝড়ে বাঁচানো গেলেও বনকে যদি বাঁচাতে না পারি, তবে শেষমেশ মানুষও বাঁচবে না।”
সমস্যা হলো—শুধু কংক্রিটের বাঁধ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয়দের কথায়, “ঝড়ের জলে বাঁধ ভেসে গেলে আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকে না।” অথচ প্রকৃতির নিজস্ব শক্তিকে ফিরিয়ে দিলে তবেই টেকসই সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। নদীর জোয়ার-ভাটা, পলি জমা—এসব বন্ধ করে দেওয়ায় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিবেশবিদেরা বলছেন, “ম্যানগ্রোভ গাছকে জায়গা দিতে হবে, নদীকে তার প্রাকৃতিক পথ ফিরিয়ে দিতে হবে।”
সুন্দরবন টিকে থাকার সঙ্গে মানুষের জীবনও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সরাসরি প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ নির্ভরশীল এই বনের ওপর। কৃষিজমি যখন লোনা হয়ে চাষের অযোগ্য হয়ে যায়, তখন তারা বনেই ভরসা খোঁজেন—কাঠ, মধু, মাছ কিংবা চিংড়ি ঘেরের জন্য। কিন্তু বন দফতরের কঠোর নজরদারির কারণে অনেক সময় এ কার্যকলাপ বেআইনি হয়ে দাঁড়ায়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষকে যদি বিকল্প জীবিকা না দেওয়া যায়, তবে বন সংরক্ষণও সম্ভব নয়। ইকো-ট্যুরিজম, টেকসই মধু সংগ্রহ, সীমিত মাছ ধরা—এসব উদ্যোগ সফল হলে মানুষ যেমন আয় পাবে, তেমনি বনও রক্ষা পাবে।
মিষ্টি জলের প্রবাহ সুন্দরবনের প্রাণরস। পদ্মা ও গঙ্গার শাখা নদী থেকে যথেষ্ট জল না এলে বন ক্রমশ লবণাক্ত হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া সমাধান অসম্ভব। ফারাক্কা বাঁধ থেকে পর্যাপ্ত জল ছাড়া না হলে বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবন বাঁচবে না। পরিবেশকর্মীদের কথায়, “এটা কেবল এক দেশের বন নয়, আন্তর্জাতিক সম্পদ। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া রক্ষা করা যাবে না।”
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, সুন্দরবন দ্রুত এক ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর দিকে এগোচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ যদি প্রাকৃতিক পলি জমার চেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকে, তবে পুরো এলাকা ডুবে যেতে পারে। লবণাক্ততা যদি গাছের সহনক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তবে নতুন প্রজন্মের গাছ জন্মাবে না। আর বাঘের আবাসভূমি যদি আরও কমে হয়, তবে তার বিলুপ্তি নিশ্চিত।
তবুও আশা হারানোর কারণ নেই। সুন্দরবনের কিছু এলাকায় সঠিকভাবে ম্যানগ্রোভ পুনঃস্থাপন করলে দেখা গেছে নদীপাড় শক্ত হয়েছে, মাছ বেড়েছে, স্থানীয় মানুষও আয় করেছে। যেসব গ্রামে কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কম। এগুলোই প্রমাণ করে—সমাধান সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সবচেয়ে জরুরি—মানুষকে সঙ্গে নেওয়া।
কারণ শেষ পর্যন্ত সুন্দরবন কেবল একখণ্ড বন নয়—এ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। কোটি মানুষের ঢাল, দেশের অর্থনীতির ভরসা, বৈশ্বিক জলবায়ুর এক অপরিহার্য অংশ। একে হারানো মানে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা পৃথিবীর ক্ষতি। তাই প্রশ্নটা এখন সবার কাছে—মানুষ বাঁচে সুন্দরবনে, কিন্তু সুন্দরবন বাঁচবে কিসে?
আসাদুজ্জামান সম্রাট, সিনিয়র সাংবাদিক ও জলবায়ুকর্মী