| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

এ দায় কার ?

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ ইং | ১৩:৫৫:৫৮:অপরাহ্ন  |  ১৪০৮০৫৪ বার পঠিত
এ দায় কার ?

আর আই রফিক : 


নয় বছরের ছেলে নয়নকে ৭ দিন যাবৎ পাওয়া যাচ্ছে না। একটি কওমী মাদ্রাসায় হেফজ পড়া নয়ন ইতিমধ্যেই ১৪ পারা মুখস্থ করে নিয়েছে। পাড়ার কেউ কেউ বলছে,  হারানোর দিন তারা নয়নকে কালামের বাড়িতে ঢুকতে দেখেছে। এরপর থেকেই নিখোঁজ। 

 এই কালাম নিতান্ত গরীব মানুষ। ছোটবেলা থেকে নয়নদের পরিবারেই কামকাজ করে বড় হয়েছে। কাজের মজুরি সঞ্চয় করে সে এক টুকরা জমি কিনেছে এবং এর উপরেই টিনের একটা ছোট বাড়িও বানিয়েছে। ৪/৫ বছর আগে নয়নের দাদা আব্দুর রহমান সাহেব ওর বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাই নয়নদের পরিবারকেই কালাম আপন মনে করে। বিয়ের পর রিকশা চালিয়ে তার সংসার চললেও এ পরিবারের সাথে আন্তরিকতা একটুও মলিন হয়নি। এরই মাঝে তাদের ঘরে এসেছে এক কন্যা সন্তান। বয়স তিন বছর। কালাম রিকশা নিয়ে বেরুলে স্ত্রী আরিফা মেয়েকে নিয়ে নয়নদের বাড়িতেই সময় কাটায়।

সে যাই হোক্, নয়নের বাবা সালমান অস্থির হয়ে ছেলেকে খুঁজছে। জনমুখে শুনে একসময় সে কালামের কাছে ছেলের কথা জিজ্ঞেস করলো। উত্তরে কালাম জানালো যে নয়ন সেদিন তার সাথেই খাওয়া দাওয়া করেছিলো। বেরিয়ে যাওয়ার সময় আইসক্রিম কিনার জন্য দশটা টাকাও চেয়েছিলো। সে দশটা টাকা বের করে দিলে সেটা হাতে নিয়েই নয়ন বেরিয়ে গেছে।

কালামের প্রতি সালমানেরও কোনো সন্দেহ ছিলো না। তবে অষ্টম দিনে সবকিছুই পাল্টে গেল। গাঁয়ের ক'জন পাশের বিলে মাছ ধরতে গিয়ে কচুরিপানার নীচে একটা বাচ্চা ছেলের হাত-পা বাঁধা লাশের খোঁজ পায়। আধা পঁচা হওয়ায় চেহারা চেনা যাচ্ছিলো না। কেবল বয়স আর গড়ন দেখে সবাই অনুমান করে নিলো, এ-ই নয়ন।

বিকেলেই এই সংবাদ স্থানীয় চকিদারের মারফত থানায় পৌঁছে গেল। পুলিশ এসে আইন মোতাবেক লাশ উদ্ধার করে পোস্টমর্টেমের জন্য মর্গে পাঠিয়ে দিলো। রাতে এসে কালামকেও  ধরে থানায় নেয়া হলো।

কালামের স্ত্রী আরিফা ভোরেই ওবাড়িতে চলে গেল এবং সন্তানকে কোলে করে সালমানের পা ধরে অনেক কান্নাকাটি করলো। কিন্তু সালমানের মন গলাতে পারেনি। 

আরো দু'দিন পর কালামকে নিয়ে পুলিশের টীম এসেছে লাশ উদ্ধার স্পটে। সেখানে সবাইকে বিস্মিত করে কালাম খুনের দায় স্বীকারে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে যাচ্ছে। কখন এবং কিভাবে সে নয়নকে হত্যা করেছে, কেনই বা লাশ কচুরিপানার নীচে রেখে গিয়েছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। 

এতে বেশ কিছুদিন এলাকার লোকজনের মুখে এই ঘটনা ছাড়া অন্য কোনো আলোচনাই নেই। কালামও আর শুধু কালাম রইলো না। সকলের মুখে সে খুনী কালাম। ওর প্রতি ধিক্কার দিতে কেউ অবশিষ্ট নেই। 

তবে এসব জনধিক্কার বিলীন হতেও বেশিদিন লাগেনি। যা হবার, তা আইনের মাধ্যমে আদালতেই হচ্ছে। চলছে খুনের বিচার কাজ।

 কালামের পক্ষে কোনো আইনজীবী নেই। থাকবে কেন ? আইনজীবীর সাথে কথা বলার কে আছে ? আর খরচ-ই বা কে দেবে ? গরীব মানুষ। বাবা-মা বেঁচে নেই। ছোট একভাই ছিলো। এখন কোথায় থাকে, তা অজানা। স্বামীহারা অসহায় আরিফাও মেয়েকে নিয়ে বিদায় হয়েছে। সুতরাং  ............ । 

 দুই বছর পর মামলার রায় হলো। হাজতখানা থেকেই খুনী কালাম শুনতে পেলো তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। দেখা করার মত মানুষ সংসারে তার নেই। তাই রায় শুনে তার প্রতিক্রিয়া কি, সেটাও কেউ জানতে পারেনি। রায়ে আদালত কী লিখেছে, আপীল করা যাবে কি না, করলে কতদিনের মধ্যে করতে হবে, এসব খোঁজ নেয়া তো বেশ দূরের বিষয়। 

 যাক্, একদিন ফাঁসি কার্যকরও হয়ে গেলো। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের দায়িত্বে তাকে কবরস্থ করা হয়েছে।

 সুবিচার পেয়ে নয়নের পরিবারের সবাই সন্তুষ্ট। জন কণ্ঠে আবার কালামের প্রতি ধিক্কার, "খুনী কালামের ফাঁসি হয়ে গেছে। আস্ত একটা বদমাশ ছিলো সে। নইলে যাদেরটা খেয়ে পরে বড় হওয়া, তাদেরই মাছুম বাচ্চাকে এভাবে মারতে পারতো না। এখন হয়েছে। কষ্ট করে বাড়িটা বানিয়েছিল। সেখানে এখন ঘুঘু চড়বে"।

 এরপরে আরো চার পাঁচ মাস কেটে গেছে। কালাম প্রসঙ্গটা আবার বিলুপ্ত। এর মধ্যে একদিন গ্রামের মানুষকে বিস্ময়ের সাগরে ডুবিয়ে নয়ন বাড়ি ফিরে এলো। এলাকাবাসী সবাই তো হতবাক। এটা কি করে সম্ভব ?

 নয়নের জবানবন্দি আর সালমানের সাথে কালামের বলা কথাগুলো হুবহু এক। নয়ন কালামের ঘরে খেয়েদেয়ে তার কাছ থেকে দশটা টাকা নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। কারণটা ছিলো, মাদ্রাসায় পড়াশোনায় চাপ।

জনমনে প্রশ্ন উঠতে লাগলো, নয়ন যদি বেঁচেই আছে, তাহলে কালাম  সেদিন খুনের কথা নিজের মুখে স্বীকার করলো কেন ? কেন বললো, নয়নকে হত্যা করে কচুরিপানার নীচে রেখেছে ? কেনই বা মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিয়ে নিজের মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করতে গেলো ? 

 এসব 'কেন' এর উত্তর আর কখনোই কারো জানা হয়নি। হয়ত হবেও না।

 এদিকে নিজেদের ভুল বুঝতে পেয়ে সালমানের পরিবারে আফসোসের শেষ নেই। অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে সালমান পরদিনই বেরিয়ে পড়লো কালামের স্ত্রী-কন্যার খোঁজে। কালামের শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে যা দেখলো, এতে তার অশ্রু সংবরণ করা কঠিন। বুঝতে পারলো, এই ঘটনায় কালাম তো ফাঁসিতে ঝুলে মরেই গেছে। তবে এর চেয়েও বেশি সাজা ভোগ করছে তার রেখে যাওয়া পাঁচ বছরের শিশুকন্যা। মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়ায় এই এতিম শিশু নিতান্ত অনাদর আর অবহেলায় কঙ্কালসার দেহ নিয়ে মামাদের সংসারে কোনরূপে টিকে আছে। ওর চোখে মুখে অভিশাপের স্পষ্ট ছাপ। 


লেখক : আর আই রফিক, কবি, গল্পকার ও উপন্যাসিক।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪