রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক : প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির উদ্দিনসহ অন্য নির্বাচন কমিশনারদের সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সাহস দেখানোর পরামর্শ দিয়ে, সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে পরিণতি কী হয়, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বুদ্ধিজীবীরা।
রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত সংলাপে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বুদ্ধিজীবীরা তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ তুলে ধরেন । প্রয়োজনে পদত্যাগেরও আহ্বানও জানান তারা ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘অনেক অর্জন থাকার পরও আমরা আমরা এখনো নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিক করতে পারিনি। যে রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে না, সে জাতি ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের সাবেক তিনজন প্রধান বিচারপতির পরিণতি আপনারা দেখেছেন।৫ আগস্টের আগে একজন প্রধান বিচারপতিকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে । আরেকজনকে ৫ আগস্টে মব করে বের করে দেওয়া হয়েছে । আরেকজন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এখন কারাগারে। আপনারা সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের পরিণতিও দেখেছেন। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, সংসদ— বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান কিন্তু নেই। পুলিশের ওপর মানুষের কোনো আস্থা নেই। এমন অবস্থায় কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ, যদি মেরুদণ্ড থাকে, যদি সাহস থাকে, তবেই স্বাধীন হতে পারবেন।
তিনি বলেন, গত ২০ বছরে সমস্ত পেশা—শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি—কালিমালিপ্ত করা হয়েছে। প্রত্যেকটি পেশার মর্যাদা শেষ করে দেওয়া হয়েছে। সব ভেঙে গেছে। কারো প্রতি কারো কোনো আস্থা বা বিশ্বাস নেই। গতবারও এসেছি, বলেছি। তারা কিন্তু সেই সাহস, মেরুদণ্ড দেখাতে পারেননি। তারা পরিণতি ভোগ করেছেন। সংলাপের দরজা কোনোদিন বন্ধ হয় না। শেষ পর্যন্ত খোলা রাখতে হয়—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। পুরো পৃথিবী বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। কমিশনকে স্বাধীন ও স্বচ্ছ হতে হবে। আমরা সেটা দেখতে চাই। আইনশৃঙ্খলা কিভাবে রিস্টোর করে কাজ করবেন, এটা বড় চ্যালেঞ্জ। সীমাহীন দুর্নীতির জায়গায় নির্বাচন করতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করতে হবে। আচরণবিধি ভাঙলে দৃশ্যমান শাস্তি আমরা বড়ভাবে দেখিনি। দুর্নীতির জায়গাটা দেখতে হবে।
তিনি বলেন, নেপালে সবে মাত্র রেজিম চেঞ্জ হয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়া আটকে দিয়ে। তাই খোলা রাখতে হবে। আলো ঠেকানোর জন্য জানালা বন্ধ করবেন না, ধুলা ঠেকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নাগরিক সমাজ, পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সোচ্চার নাগরিক সমাজ জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি করবে। পৃথিবীর সব সরকার মিথ্যা বলে। সাংবাদিকরা ভুল-ত্রুটি ধরে শোধরানোর চেষ্টা করবে। নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু, চা শ্রমিক, বেদে সম্প্রদায়—তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে।
সাংবাদিক, কলামিস্ট সোহরাব হাসান বলেন, ইসির প্রতি আমাদের আস্থা আছে কিনা, তার চেয়ে বড় কথা হলো বর্তমান নির্বাচন কমিশন মনে করে কিনা যে বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। যদি মনে করে তাহলে পরবর্তী নির্বাচনের দায় নিতে হবে। আর যদি মনে না করে তাহলে আগামী পাঁচ মাসে সরকারের কী করা উচিত তা জনসম্মুখে জানাতে হবে। তাহলে ইসির প্রতি জনআস্থা আসবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন করে জনগণ। কিন্তু জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার, ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তারা সহায়তা না করলে সম্ভব নয়। আপনাদের যেমন নির্বাচন করার মানসিকতা থাকতে হবে, তেমনি নির্বাচন না করার মানসিকতাও থাকতে হবে। যদি মনে করেন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তাহলে নির্বাচন থেকে সরে আসা উচিত, আপনাদের পদত্যাগ করা উচিত। বিগত ইসিকেও একই কথা বলেছিলাম। নির্বাচন মানেই উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা। সেটা না থাকার যথেষ্ট পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো জিততেই হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় যে শক্তি আসবে আমরা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব। কিন্তু আমরা তো সেই শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। সব প্রার্থীরা একই মঞ্চে প্রচার করবে এমন ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কালো টাকার প্রভাব কমবে।
তিনি আরও বলেন, কিছু দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার প্রস্তুতি চলছে। একটি পক্ষকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। ঐক্যমত কমিশনে ৩০টি দলের সঙ্গে কথা হচ্ছে। সেখান থেকেও কেউ যদি বলে নির্বাচনে যাবে, তাহলে পরিস্থিতি কী হবে, সে বিষয়টা ভাবতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, সেরা নির্বাচন হবে। তাহলে কাউকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে সেরা নির্বাচন কীভাবে হবে?
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার বলেন, গত ২০ বছরের সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই দিকটা লক্ষ্য রেখে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারেন, ইতিহাসের পাতায় আপনাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভোট হলে সারা পৃথিবী নতুন নতুন জিনিস পায়। এজন্য তারা আগ্রহভরে পর্যবেক্ষণ করে। একবার বলা হলো রাতের ভোট হয়েছে—তারা নতুন কিছু পেলেন। আরেকবার বললেন ১৫১ হলে সরকার গঠন করা যায়—১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়ে গেল। তাই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং যারা কাজ করেন, তারা বাংলাদেশ থেকে নতুন কিছু পান। তবে আমি বলব, এমন কিছু করুন যাতে তারা ইতিবাচক কিছু পান।
জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, মার্কা না দিলে মানি না—এটা ঠিক না। ইসি স্বাধীন। এ বিষয়ে চাপ দেওয়া উচিত না। যে মার্কা দেবে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকুন। মার্কা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা উচিত না। রাষ্ট্র মেরামতের যে অপূর্ব সুযোগ ছাত্ররা এনেছেন, এই পরিস্থিতিতে যদি স্থানীয় নির্বাচন আগে করেন তাহলে একটা বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। তাই সংসদ নির্বাচনটাই অবিতর্কিতভাবে সম্পন্ন করা উচিত।
বিজিএমইএ পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইন বলেন, শুধু ঋণখেলাপিদের নয়, যারা অর্থপাচারকারী তারাও যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সেই আইন করতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে জনগণ আপনাদের প্রতি অনেক প্রত্যাশা রাখে। গত ১৫ বছর বা এখনও সহিংসতা নরমালাইজ হয়ে গেছে। নির্বাচনের সময় আপনারা এটা কিভাবে মোকাবিলা করবেন সেটা দেখার বিষয়।
কবি মোহন রায়হান বলেন, এখনও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বৈরাচারের প্রেতাত্মারা রয়েছে। তারা কিন্তু সুন্দর নির্বাচন হতে বাধা দেবে। এই বিষয়ে ইসিকে সজাগ থাকতে হবে। তবে নির্বাচন অবাধ করতে গেলে প্রথমে প্রয়োজন আপনাদের সদিচ্ছা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ৫৫ বছর পরও নারীদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ আসনের কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের ন্যূনতম দাবি—৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নিশ্চিত করা। এছাড়া প্রবাসীদের সন্তানরা পড়াশোনার জন্য দেশে থাকে। তাদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণও গুরুত্ব দিতে হবে।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ হারুন চৌধুরী বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ভোটাররা যেন নিরাপত্তা পায়, তা এখনই দৃশ্যমান করতে হবে। অনেক প্রার্থী পোলিং এজেন্ট দিতে পারে না। বড় দলগুলো ভয়ভীতি দেখায়। এটা যেন না হয় তা কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধি জারিফ রহমান বলেন, অদৃশ্য একটা ভয় নির্বাচনের আগে বিরাজ করে। ভোটের আগে দাগী আসামিরা যেন অংশ নিতে না পারে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচন-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেন বজায় থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে ফ্যাক্ট-চেকিং ও কুইক রেসপন্স টিম গঠন করতে হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন সমাপনী বক্তব্যে বলেন, আমরা নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতে চাই। সবাই যাতে দেখতে পারে সে ব্যবস্থা করতে চাই। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানাব। দেশিয় পর্যবেক্ষক যতটা পারি বেশি নিবন্ধন দিতে চাই। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের পরামর্শ বাস্তবায়ন করার। অতীতের মতো হবে না। আমরা অনিয়ম হলে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা ফিরিয়ে এনেছি।আগতদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের দরজা সব সময় খোলা। যেকোনো সময়ে আপনাদের সুপারিশ আমরা গ্রহণ করব। কল রেকর্ড ফাঁস হওয়ার ভয়ে টেলিফোনে কথা বলি না। সামনাসামনি অফিসে কথা বলি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথম দফার এ সংলাপে ৩০জন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বুদ্ধিজীবীদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও সংলাপে অংশ নেন ১৪ জন।
সিইসি’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আমন্ত্রিতদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মাহমুদ হাসানউজ্জামান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মো. মাহফুজুর রহমান, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াজেদ প্রমুখ।
এসসি