রিপোর্টার্স২৪ডেস্ক: রাজধানীর পাঁচটি প্রধান সরকারি হাসপাতাল এখন ভূমিকম্প ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দুতে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একাধিক ভূমিকম্পে আতঙ্কিত নগরবাসী হাসপাতালে ছুটে গেলে আদৌ নিরাপদ চিকিৎসা পাবেন কি না—এমন প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। বিশেষত পুরোনো ও জরাজীর্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবা চলায় উদ্বেগ বেড়েছে নাগরিকদের মধ্যে।
২০১৭ সালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জরিপে দেখা যায়, শুধু ঢাকার ৪৩৩টি হাসপাতালের মধ্যে ২৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৭৪টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে ঢাকার পাঁচটি বড় হাসপাতাল—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল), জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন ইনস্টিটিউট (পঙ্গু হাসপাতাল) এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল—‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত।
এর মধ্যে মিটফোর্ডের ভবনগুলোর বয়স প্রায় ১৫০ বছর। ঢামেকের মূল ভবন ১২০ বছর পুরোনো। পিজি হাসপাতালের দুটি ভবন ৬৫ বছর, পঙ্গু ও শিশু হাসপাতালের ভবনগুলোর বয়স ৫৩ বছর। এসব পুরোনো ভবনে প্রতিদিন হাজারো রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং চিকিৎসা–শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল নিজেই যদি ঝুঁকিতে থাকে, রোগীর জীবন কে দেখবে? জরাজীর্ণ ভবনগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়নে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করা জরুরি। নতুন ভবন নির্মাণেও ভূমিকম্প সহনশীলতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান, সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তকরণ চলছে। তিন শতাধিক ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে। পুরান ঢাকায় বিশেষ অভিযান চলছে; কিছু ভবন সিলগালাও করা হয়েছে।
ঢামেক: পলেস্তারা খসে পড়া নিত্যদিনের ঘটনা
২৬০০ শয্যার ঢামেক ভবনের ছাদ–দেওয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়া, পানি চুইয়ে পড়া, বৈদ্যুতিক পাখা খুলে পড়া নিয়মিত ঘটনা। মূল ভবন বহু আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। ছাদের অংশ খসে পড়ে রোগী ও চিকিৎসকের আহত হওয়ার ঘটনাও আছে। আবাসিক হলের অংশ মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ায় কয়েক তলা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে, তবে বিকল্প না থাকায় শিক্ষার্থীরা থাকতে বাধ্য।
মিটফোর্ড: দেড়শ বছরের পুরোনো ভবনে বিপুল রোগী
৯০০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১২০০ রোগী ভর্তি থাকেন। বহু পুরোনো ভবন নিয়ে পিডব্লিউডি ২০০৯ সালেই ‘পরিত্যক্ত ঘোষণা’র সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে ব্লাডব্যাংক, গ্যাস্ট্রো ও লিভার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা।
পঙ্গু হাসপাতাল: নতুন ভবনেও ফাটল
২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পে নতুন ১২ তলা ভবনে ফাটল দেখা দেয়। পিডব্লিউডি বলছে, বড় কোনো ক্ষতি নয়, তবে ভবন পরিদর্শন করে মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পিজি হাসপাতাল: দুই ব্লক ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’
রাজউকের জরিপে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ’ ও ‘বি’ ব্লককে অত্যন্ত বিপজ্জনক ঘোষণা করা হয়। একটি ব্লকে রয়েছে আবাসন–ক্যান্টিন, অন্যটিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম।
শিশু হাসপাতাল: ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দশ বছর আগে
২০১৪ সালে ‘এ’ ব্লক ও স্টাফ কোয়ার্টার ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা হয়। ভূমিকম্পের পর চতুর্থ তলার মিলনায়তন–লাইব্রেরি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে, তবে কোয়ার্টার এখনো খালি হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে শুধু ভবনের ক্ষয়ক্ষতিই নয়, চিকিৎসা ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসা নিতে ছুটে আসা মানুষ কোথায় আশ্রয় পাবেন—এটা এখন বড় প্রশ্ন।