ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: একসময় পর্যাপ্ত ফলজ ও বনজ গাছ থাকায় ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ভবনগর গ্রামে কালোমুখো হনুমানদের খাবারের কোনো সংকট ছিল না। তবে গাছপালা কমে যাওয়া, বাগান উজাড় হওয়া এবং মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় এখন তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে এই বিরল প্রজাতির প্রাণীগুলো।
সরেজমিনে ভবনগর গ্রামে গেলে দেখা যায়, এক ডাকেই ছুটে আসে শত শত কালোমুখো হনুমান। তারা কখনো গাছে, কখনো বাড়ির ছাদে, আবার কখনো মানুষের আশপাশে বসে সময় কাটায়। খাবারের সন্ধানে প্রায়ই তারা লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, আবার পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়।
স্থানীয় যুবক নাজমুল হোসেন প্রতিদিন নিজ উদ্যোগে সরকারি বরাদ্দের খাবার হনুমানদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে তিনি জানান, বরাদ্দকৃত খাবার প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এতে শতাধিক হনুমান একবেলা ঠিকমতো খেতে পারছে না। তিনি বলেন, ডাক দিলেই হনুমানগুলো ছুটে আসে। এখন তারা আমাদের পরিবারের সদস্যের মতোই হয়ে গেছে।
ভবনগরের হনুমান দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ তাদের দেখে মুগ্ধ হন। তবে খাবারের অভাব ও অরক্ষিত পরিবেশের কারণে কখনো কখনো হনুমানগুলো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, কালোমুখো হনুমান রক্ষায় তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ, শিকারি প্রাণীর হাত থেকে সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি সরকার ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে খাবারের বরাদ্দ বাড়ানো এবং কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে মানুষের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
ঝিনাইদহ জেলা ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, বন বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতিদিন বাদাম, কলা ও সবজি সরবরাহ করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, “হনুমানগুলো মূলত ভবনগর গ্রামেই অবস্থান করে। জেলায় বনাঞ্চল না থাকায় এখানে অভয়ারণ্য ঘোষণার সুযোগ সীমিত।”
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ভবনগর গ্রামে দুই শতাধিক কালোমুখো হনুমান রয়েছে। একসময় এই সংখ্যা বর্তমানের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংস, খাদ্য সংকট ও মানবসৃষ্ট বৈরী পরিবেশের কারণে তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে এই বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান বিলুপ্তির পথে চলে যাবে, যা এলাকার জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই এখনই সুপরিকল্পিত সংরক্ষণ, স্থায়ী খাদ্যব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।