বেনাপোল প্রতিনিধি: যশোরের শার্শা উপজেলায় টানা ১০ দিন ধরে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে উপজেলাজুড়ে বোরো ধানের বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চারা বিবর্ণ হয়ে হলুদ ও লালচে রং ধারণ করছে। এ সময়ে যেসব কৃষক বোরো ধানের বীজতলায় ধান ফেলেছিলেন, তাদের অনেকের চারা অঙ্কুরোদগম হয়নি। ফলে তাদের আবার বীজতলা তৈরি করতে হবে।
তবে কৃষকরা কোথাও বীজতলায় ছাই ছিটিয়ে, কোথাও ওষুধ প্রয়োগ করে এবং কোথাও পলিথিন দিয়ে ঢেকে রেখে চারা রক্ষার চেষ্টা করছেন। জমিতে চারা রোপণের আগেই শীত ও কুয়াশায় বীজতলা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। এতে খরচ বৃদ্ধি পাবে বলে তারা জানান। ফলে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
যশোর বিমানবাহিনীর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটিসংলগ্ন আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, পৌষ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই উপজেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। বর্তমানে তা রূপ নিয়েছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে। গত রোববার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গত সোমবার ছিল ৯ দশমিক ০৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর আগে গত ১০ দিনের মধ্যে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা পাঁচ দিন যশোরে রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার তাপমাত্রা ছিল ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তার আগের দিন বৃহস্পতিবার ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত বুধবারও একই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ২৭ ডিসেম্বর তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি এবং ২৬ ডিসেম্বর ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হিসেবে বিবেচিত হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি এবং ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়।
উপজেলায় বর্তমানে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকেই চারদিকে কুয়াশার জাল ছড়িয়ে পড়ছে। গত ১০ দিনের মধ্যে মাত্র দুই দিন সূর্যের দেখা মিলেছে। বাকি আট দিন কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল পুরো এলাকা। এতে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে কৃষি খাত। বিশেষ করে বোরো ধানের বীজতলা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
কৃষকরা জানান, ইতোমধ্যে বীজতলায় ব্যাপক হারে ক্ষতি হয়েছে। শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে চারাগুলো হলুদাভ হয়ে মরে যাচ্ছে, যা ‘কোল্ড ইনজুরি’ নামে পরিচিত। এতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। কারণ অনেক ক্ষেত্রে চারা নষ্ট হওয়ায় বাইরে থেকে চড়া দামে চারা কিনতে হতে পারে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমি। এ জন্য বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৭১ হেক্টর জমি। এর মধ্যে বর্তমানে ১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা প্রস্তুতির কাজ চলছে।
উপজেলার লক্ষণপুর ইউনিয়নের এক গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেন বলেন, “গত কয়েকদিনের কুয়াশার কারণে ধানের চারা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা রাতের বেলায় পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখছি। শীত ও কুয়াশা যদি আরও বাড়ে, তাহলে বীজতলা কোল্ড ইনজুরি থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”
পুটখালী বারোপোতা গ্রামের কৃষক রওশন আলী জানান, তিনি এবার দুই বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। এভাবে যদি শীতের সঙ্গে কুয়াশা পড়া অব্যাহত থাকে, তাহলে বীজতলা ক্ষতির মুখে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ডিহি গ্রামের কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, তিনি এক বিঘা জমিতে আগেভাগেই ধান রোপণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এখনো চারা রোপণ করতে পারছেন না।
বাগআঁচড়া গ্রামের চাষি শাহিনুর রহমান বলেন, প্রতি বছর তিনি ১০ থেকে ১২ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেন। এ বছরও সমপরিমাণ জমিতে চাষের প্রস্তুতি চলছে। তবে শীতের কারণে চারা রোপণের উপযোগী অবস্থায় নেই বলে তিনি জানান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার শাহ বলেন, ব্রি ধান-৬৩, ৮৮, ৮৯, ১০১, ১০২, ১০৪ ও মিনিকেটসহ বিভিন্ন জাতের ধানের চাষ বেশি হচ্ছে। ধান রোপণের জন্য চারা প্রস্তুত রয়েছে। কিছু এলাকায় শীত ও কুয়াশার কারণে চারার সামান্য ক্ষতি হয়েছে, তবে পুরোপুরি নষ্ট হয়নি।
তিনি আরও বলেন, কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, চলতি মৌসুমেও বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা সম্ভব হবে।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশারফ হোসেন জানান, কিছু বীজতলার চারা হলুদ হয়েছে, তবে পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তিনি শৈত্যপ্রবাহের সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা, রাতে ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার গভীরতায় পানি ধরে রাখা এবং সকালে পানি বের করে নতুন পানি দেওয়ার পরামর্শ দেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন