আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের কর্তৃপক্ষ ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ দমন করতে শুক্রবার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। ফলে ইরান কার্যত বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একই সময় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিভিন্ন শহরের রাস্তায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে ভবন ও যানবাহনে আগুন জ্বলছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, সরকার কোনোভাবেই পিছু হটবে না। তিনি বিক্ষোভকারীদের প্রবাসী বিরোধী গোষ্ঠী ও যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট বলে অভিযোগ করেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।
গত দেড় দশকের অন্যান্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা মানবাধিকার আন্দোলনের তুলনায় এবারের বিক্ষোভে সমাজের সব স্তরের মানুষ পুরোপুরি জড়িত না হলেও, এতে ইতোমধ্যে ডজনখানেক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট এবং গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পরিণতির কারণে কর্তৃপক্ষ এবার তুলনামূলকভাবে বেশি চাপে রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে রাজনৈতিক স্লোগান
প্রথমদিকে বিক্ষোভের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক সংকট। গত বছর ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান ডলারের বিপরীতে অর্ধেকে নেমে আসে এবং ডিসেম্বর মাসে মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের স্লোগান সরাসরি সরকার ও শাসকদের বিরুদ্ধে রূপ নেয়।
আগুনে জ্বলছে ভবন ও যানবাহন
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশ থেকে তথ্য বের হওয়া অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। ইরানে ফোন করলেও সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। দুবাই বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, দুবাই ও ইরানের মধ্যে অন্তত ১৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
গত মাসের শেষ দিকে দোকানদার ও বাজারের ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতি ও রিয়ালের অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন। পরে তা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাদেশিক শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। তরুণদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়, বাস, গাড়ি ও মোটরসাইকেলে আগুন জ্বলছে। পাশাপাশি পাতাল রেল স্টেশন ও ব্যাংকে আগুন দেওয়ার দৃশ্যও দেখানো হয়। সরকার এসব সহিংসতার জন্য ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বিরোধী সংগঠন পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন (এমকেও)-কে দায়ী করেছে।
কাস্পিয়ান সাগর উপকূলবর্তী শহর রাশতের শারিয়াতি স্ট্রিটে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে এক রাষ্ট্রীয় টিভি সাংবাদিক বলেন,এটা যেন যুদ্ধক্ষেত্র সব দোকান ধ্বংস হয়ে গেছে।
রয়টার্স যাচাইকৃত ভিডিওতে রাজধানী তেহরানে শত শত মানুষকে মিছিল করতে দেখা যায়। একটি ভিডিওতে এক নারীকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়,খামেনির মৃত্যু হোক!
গুলিবর্ষণ ও কঠোর হুঁশিয়ারি
ইরানি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানায়, বালুচ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জাহেদানে শুক্রবার নামাজের পর অনুষ্ঠিত এক মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হয়, এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
কর্তৃপক্ষ একদিকে অর্থনৈতিক দাবিতে হওয়া বিক্ষোভকে ‘বৈধ’ বললেও, অন্যদিকে সহিংস বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছে।
ভাষণে খামেনি বলেন,ইসলামি প্রজাতন্ত্র শত সহস্র সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধ্বংসকারীদের সামনে এটি কখনো মাথা নত করবে না।তিনি বিক্ষোভকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন।
বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলেন,দাঙ্গাকারীদের শাস্তি হবে চূড়ান্ত, সর্বোচ্চ এবং কোনো আইনি শিথিলতা ছাড়া।
বিভক্ত বিরোধী শক্তি
ইরানের প্রবাসী ও বিভক্ত বিরোধী গোষ্ঠীগুলো আরও বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছে। রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের স্লোগানের মধ্যে রয়েছে ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক!’ এবং ১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া রাজতন্ত্রের প্রশংসাসূচক বক্তব্য।
নির্বাসিত সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি সামাজিক মাধ্যমে ইরানিদের উদ্দেশে বলেন,সারা বিশ্বের চোখ আপনাদের দিকে। রাস্তায় নেমে আসুন।তবে ইরানের ভেতরে রাজতন্ত্র বা এমকেও-এর প্রতি প্রকৃত সমর্থন কতটা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি গত গ্রীষ্মে ইরানে বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সম্প্রতি বিক্ষোভকারীদের সহায়তার ইঙ্গিত দেন, শুক্রবার বলেন তিনি পাহলভির সঙ্গে দেখা করবেন না এবং তাকে সমর্থন করা “উপযুক্ত হবে কিনা,তা নিশ্চিত নন।
জার্মানি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং ইরানে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন করার সুযোগ দিতে হবে। রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি