শেরপুর প্রতিনিধি: গারো পাহাড়সংলগ্ন শেরপুরের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি মাতৃভাষা দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে স্থানীয় প্রতিনিধি, শিক্ষক ও গবেষকেরা ভাষা সংরক্ষণে সমন্বিত ও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তজুড়ে গারো, হাজং, কোচ ও বানাইসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ি যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য এবং বন্য হাতি, বন্য শুকর ও বিষাক্ত সাপের ঝুঁকির মধ্যেই তাদের জীবনযাপন। এই বাস্তবতায় শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে; একইসঙ্গে কমে যাচ্ছে মাতৃভাষার চর্চা।
স্থানীয় শিক্ষক ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ পরিবারে শিশুদের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলার প্রবণতা বাড়ছে। মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাতৃভাষার ব্যবহার না থাকায় নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিজস্ব ভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য তরুণদের শহরমুখী অভিবাসনও ভাষা হারানোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের পাঁচটি মাতৃভাষায় পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে মাঠপর্যায়ে এর সুফল সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় শিক্ষকদের দাবি, চলতি বছর অনেক বিদ্যালয়ে সময়মতো মাতৃভাষার বই পৌঁছায়নি।
মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা (এমএলই) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষক পরিমল কোচ বলেন, কোচসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। নিয়মিত পাঠ ও চর্চা না থাকলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই এসব ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তিনি ভাষা সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান।
বারোমারি সেন্ট লিও স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা অগ্নেশ সরেন বলেন, একটি জাতির অস্তিত্বের প্রধান ভিত্তি তার ভাষা। পাহাড়ঘেঁষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর হলেও এ বছর গারো ভাষার পাঠ্যপুস্তক পাওয়া যায়নি। বছরের শুরু থেকেই মাতৃভাষার বই হাতে পেলে শিশুদের শেখানো সহজ হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান, লোকগান ও ধর্মীয় প্রার্থনায় মাতৃভাষার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। এখন সেই পরিসর সংকুচিত হওয়ায় ভাষার ব্যবহারও সীমিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের শিক্ষিত তরুণদের শহরমুখী হওয়ায় গ্রামে শিশুদের মাতৃভাষা শেখার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কারিতাস-এর নালিতাবাড়ী উপজেলা সমন্বয়কারী হিলারিয়ুস রিছিল বলেন, গারো, হাজং ও কোচ সম্প্রদায়ের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আগে মাতৃভাষা শেখার সুযোগ দিতে তারা কাজ করছেন। তবে বৃহৎ পরিসরে সরকারি সহায়তা ছাড়া ভাষা সংরক্ষণ সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ৪৬টি ভাষার মধ্যে ৪০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা; এর অন্তত ১৪টি ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ঝুঁকিতে থাকা ভাষাগুলোর উপাত্ত সংগ্রহ ও নথিভুক্তকরণ কার্যক্রম চলছে। ভাষা টিকিয়ে রাখতে গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি বলে তিনি মত দেন।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি