আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে আবারও তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। সীমান্তজুড়ে গোলাবর্ষণ ও মর্টার হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে এবং এটি এখন “খোলা যুদ্ধ”।
কীভাবে শুরু হলো সংঘর্ষ?
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তালেবান বাহিনী পাকিস্তানের বিভিন্ন সীমান্তচৌকিতে হামলা চালায়। কাবুলের দাবি, গত সপ্তাহান্তে পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তানে অন্তত ১৮ জন নিহত হওয়ার জবাব হিসেবেই এ আক্রমণ।
জবাবে শুক্রবার ভোরে পাকিস্তান “গাজাব লিল হক” (অপারেশন রাইটিয়াস ফিউরি) নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। পাকিস্তানি বিমান হামলা কাবুল, পাকতিয়া প্রদেশ এবং কান্দাহারে আঘাত হানে। কান্দাহারকে তালেবানের আধ্যাত্মিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে তাদের শীর্ষ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাঅবস্থান করছেন বলে ধারণা।
হতাহতের ভিন্ন তথ্য
পাকিস্তানের দাবি, তাদের হামলায় ১৩৩ তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান বলছে, তাদের আট সেনা নিহত হয়েছেন। দুর্গম সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষ চলায় হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পাকিস্তানের বাজাউর জেলায় তালেবানের ছোড়া একটি মর্টার শেল একটি বাড়িতে আঘাত করলে দুই শিশুসহ পাঁচজন আহত হন বলে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে।
পুরোনো উত্তেজনার পুনরাবৃত্তি
দুই দেশের মধ্যে জটিল সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০২৫ সালের অক্টোবরেও বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছিল, এরপর একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল।
২০০১ সালে ন্যাটো বাহিনী তালেবান সরকারকে উৎখাত করার পর পাকিস্তানকে তালেবানের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে দেখা হতো। তবে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পর তালেবান পুনরায় কাবুলের ক্ষমতায় ফেরে। এরপর থেকেই পাকিস্তানে জঙ্গি হামলা বেড়েছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে, পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় পাচ্ছে—যদিও কাবুল তা অস্বীকার করে।
পাকিস্তানি সামরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে জঙ্গি হামলায় ১,২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন—যা ২০২১ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।
সামরিক শক্তির তুলনা
লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান) (আইআইএসএস)-এর ‘মিলিটারি ব্যালান্স ২০২৫’ অনুযায়ী, পাকিস্তানের সক্রিয় সেনাসদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার। এর সঙ্গে রয়েছে নৌ, বিমান ও মেরিন বাহিনী এবং প্রায় ৩ লাখ আধাসামরিক সদস্য। দেশটি একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।
পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬, ফ্রান্সের মিরাজ এবং চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনীর সদস্য সংখ্যা আনুমানিক দুই লাখের কম। তাদের কার্যকর বিমানবাহিনী নেই; সোভিয়েত আমলের কিছু হেলিকপ্টার ও ড্রোনের ওপর নির্ভরশীল। তবে দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত।
সামনে কী?
অতীতে সৌদি আরব ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় সংঘর্ষ থেমেছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে তা পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
ক্রাইসিস গ্রুপের দক্ষিণ এশিয়া প্রকল্প পরিচালক সামিনা আহমেদ বলেছেন, আফগান ভূখণ্ডে টিটিপি নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পাকিস্তান আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। তিনি উভয় দেশকে তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মতো অংশীদারদের সহায়তায় দ্রুত আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি