স্টাফ রিপোর্টার: বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। সেই পথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করলে তা জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে দেশটি।
আজ মঙ্গলবার ইরানের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয় ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছে, সব ধরনের নৌযানের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ পথে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে হামলা চালানো হবে।
ইরানি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, গতকাল সোমবার বিপ্লবী বাহিনীর কমান্ডারের উপদেষ্টা কৌশলগত এই প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেন। কোনো জাহাজ প্রবেশ করলে ‘জ্বালিয়ে’ দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
ইরানি বিপ্লবী বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি বলেন, ‘প্রণালি এখন বন্ধ। যদি কোনো জাহাজ এখান দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টা করে, তাহলে বিপ্লবী রক্ষী ও নৌবাহিনী সেগুলো পুড়িয়ে দেবে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আহমেদ ওয়াহিদির পূর্বসূরি মোহাম্মদ পাকপৌর নিহত হন। সেই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।সেদিন থেকেই হরমুজ প্রণালি বন্ধের জল্পনা চলছিল।
সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, নৌপথে বহন করা বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩১ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই নৌপথ বন্ধ হলে তা বৈশ্বিক তেল খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ইরানের দক্ষিণ সীমান্তের এই প্রণালি দিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে। মূলত হরমুজ প্রণালির মাধ্যমেই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তেল-গ্যাস পাঠানো হয়।ইতিহাস বলছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগে।
বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ন্যুবার্জার বেরমানের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ম্যানেজার হাকান কায়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের প্রভাবকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।’
তার মতে, প্রণালি এক-দুই সপ্তাহ আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকলে তেল কোম্পানিগুলো সেই ক্ষতি সামাল দিতে পারবে। তবে এক মাস বা তার বেশি সময় বন্ধ থাকলে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
গত সোমবার ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৭০ ডলার। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অল্প সময়ের মধ্যেই তা ১০০ ডলার ছুঁতে পারে।
এর ফলে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বাড়তে পারে।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল হরমুজ প্রণালি নামে পরিচিত। সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার (২১ মাইল)।
তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাইপলাইনের মাধ্যমে বিকল্প পথে তেল রপ্তানি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন জানিয়েছে, হরমুজ দিয়ে রপ্তানি হওয়া অধিকাংশ জ্বালানির কার্যকর বিকল্প এই অঞ্চলে নেই।
প্রণালি বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়ার নজির রয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের জুনে ইসরায়েল-ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় এমন পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
তথ্য-বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার এক এক্স পোস্টে জানিয়েছে, প্রণালিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে সেখানে তেলের ট্যাংকার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
প্রণালির উভয় পাশে একাধিক জাহাজে হামলার তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের নৌ-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। ওমান উপসাগরে মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি ট্যাংকারে নৌ-ড্রোন হামলায় অন্তত এক নাবিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ওমান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছিল ওই জাহাজটি।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি