| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ঠেকাতে ইরানের কৌশল

reporter
  • আপডেট টাইম: মার্চ ১৪, ২০২৬ ইং | ১৩:৫৪:২০:অপরাহ্ন  |  ৩৩৭৭১৯ বার পঠিত
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ঠেকাতে ইরানের কৌশল
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার আগেই সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য বিশেষ কৌশল তৈরি করেছিল ইরান। সামরিক শক্তিতে প্রতিপক্ষের তুলনায় দুর্বল হওয়ায় তেহরান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহপথকে চাপের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করে,এমন তথ্য জানিয়েছেন ইরানের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত তিনটি আঞ্চলিক সূত্র।

দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল, বড় ধরনের সংঘাতে জড়ালে তারা পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলপথ হরমুজ প্রণালী সীমিত করে দিতে পারে। এই সংকীর্ণ প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ; এখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা সঙ্গে সঙ্গেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রণালী দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল ৯৭ শতাংশ কমে গেছে বলে জানা গেছে।

ইরান অতীতেও একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করেছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় “ট্যাঙ্কার যুদ্ধ” নামে পরিচিত সংঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে হামলার ঘটনা এত বেড়ে যায় যে তা বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পরিণত হয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রকে ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালী পার করাতে হয়েছিল।

তবে এখন ইরানের হাতে আরও শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। স্বল্পমূল্যের বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে তারা বিস্তৃত এলাকায় জাহাজ চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলতে সক্ষম। চলতি মাসে ইরানের হামলাগুলো দেখিয়েছে, বড় ধরনের মাইন পাতা ছাড়াই তারা কত দ্রুত প্রণালীতে নৌচলাচল বিঘ্নিত করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সমানভাবে লড়াই করা ইরানের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তারা সংঘাতকে সময় ও ভৌগোলিক পরিসরে বিস্তৃত করে প্রতিপক্ষকে চাপের মুখে ফেলতে চায়।

আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষণ সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলী ওয়ায়েজ বলেন, ইরান জানে তারা সরাসরি যুদ্ধে জিততে পারবে না। কিন্তু যদি তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করতে পারে, তাহলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই পিছিয়ে যেতে বাধ্য হতে পারে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরানের শক্তিশালী বাহিনী ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়।

ইরানের কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো,বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং একই সঙ্গে অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর বিচ্ছিন্ন আক্রমণ চালানো। এর মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটনের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করার চাপ বাড়াতে চায়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক মাইকেল আইজেনস্ট্যাড বলেন, এটি অসম যুদ্ধের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অল্পসংখ্যক হামলার মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক পর্যায়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে চাইছে।

তিনি বলেন, এসব হামলার উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধবিরোধী চাপ বাড়ে এবং সরকার যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

ইরান একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে বাহিনী জড়ো না করে উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। আগে এসব আক্রমণ অনেক সময় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো,যেমন ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া ও লেবাননের মিত্র গোষ্ঠীগুলো। কিন্তু এবার ইরান নিজেই সরাসরি এই কৌশল বাস্তবায়ন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই “মোজাইক” সামরিক কৌশল এমনভাবে সাজানো যে নেতৃত্ব বা কমান্ড কাঠামোর ওপর বড় ধরনের হামলা হলেও যুদ্ধ পরিচালনা অব্যাহত রাখা যায়।

আলী ওয়ায়েজ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করতে পারলেও পুরোপুরি পরাজিত করতে চাইলে স্থলযুদ্ধে নামতে হবে। এতে প্রায় দশ লাখ সেনা প্রয়োজন হতে পারে, যা বাস্তবায়নের মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ওয়াশিংটনের নেই।

একসময় বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক সংঘাতে জড়িয়েছেন, যাকে অনেক বিশ্লেষক ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান বলে মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য টিকে থাকা। দীর্ঘমেয়াদে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চায় যে সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কোনোটিই তাদের নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারবে না।

তবে এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং যুদ্ধক্ষেত্রকে ইরানের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে দিয়ে তেহরান মনে করছে—শক্তিশালী প্রতিপক্ষের চেয়ে তারা বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪