আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লেবাননে চলমান সংঘাতের মধ্যে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির মুখে পড়েছেন সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা। ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শরণার্থী শিবিরগুলোকে সরাসরি আঘাত করায় তাদের জীবন আরও অনিরাপদ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বাস্তুচ্যুতির ট্রমা আবারও তীব্র হয়ে উঠছে।
লেবাননের ত্রিপোলি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের আক্কা (বর্তমান ইসরায়েলের অংশ) অঞ্চল থেকে পালিয়ে লেবাননে আশ্রয় নিয়েছিলেন মানাল মাতারের দাদা-দাদি। তারা ভেবেছিলেন অল্প সময়ের মধ্যেই নিজভূমিতে ফিরতে পারবেন। কিন্তু সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দক্ষিণ লেবাননের টায়ার শহরের কাছে রশিদিয়েহ শরণার্থী শিবিরেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তারা।
গত ২ মার্চ ভোরে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের বাড়ির আশপাশে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করলে আবারও পালাতে বাধ্য হন মানাল ও তার পরিবার। চারদিকে শুধু বোমার শব্দ ছিল। আমরা একদিনেরও বেশি সময় ধরে পথে ছিলাম, বলেন তিনি। বর্তমানে তারা উত্তর লেবাননের ত্রিপোলির বেদ্দাওয়ি শরণার্থী শিবিরে আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘নতুন নাকবা’ হিসেবে দেখছেন ১৯৪৮ সালের সেই বৃহৎ বাস্তুচ্যুতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে। ইসরায়েল ২ মার্চ থেকে লেবাননে হামলা জোরদার করে, যা শুরু হয় হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণের পর। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, জাতিসংঘ ও লেবানন সরকারের হিসাব অনুযায়ী এরপরও হাজার হাজারবার তা লঙ্ঘিত হয়েছে।
ইসরায়েলি হামলার ফলে ইতোমধ্যে লেবাননে ৮ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের উপকণ্ঠসহ বিভিন্ন এলাকায় গণউচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব অঞ্চলের মধ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোও রয়েছে,যেমন রশিদিয়েহ, বুর্জ শেমালি, এল-বুস, বুর্জ আল-বারাজনে ও শাতিলা।
বর্তমানে লেবাননে প্রায় দুই লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী বাস করেন, যারা আগে থেকেই কর্মসংস্থানে নানা বিধিনিষেধের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অনেকেই আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, ভাড়া বাসা বা হোটেলে আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মূলত লেবানিজ নাগরিকদেরই স্থান দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
টায়ারের এল-বুস শিবিরের বাসিন্দা ইয়াসের আবু হাওয়াশ বলেন, “আমি এখন সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা ১৯৪৮ সালে আমার বাবা-মা পার করেছিলেন। এটা নতুন নাকবা, যা প্রতি দশ বছর পরপর ফিরে আসে।”
বেদ্দাওয়ি শিবিরের কর্মকর্তাদের মতে, বৈরুত ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে পালিয়ে অন্তত ২৫০টি ফিলিস্তিনি পরিবার এখানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদেরই একজন দালাল দাওয়ালি। দুই দশক আগে বিয়ের পর তিনি বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে চার সন্তানকে নিয়ে মায়ের বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি, তবে তার স্বামী এখনও সেখানে অবস্থান করছেন।
দালাল বলেন, প্রতিদিনই আমরা যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করি, যাতে আবার ঘরে ফিরতে পারি। তার মা এম আয়মান জানান, তাদের পরিবারও ১৯৭৪ সালে আরেক দফা সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই সময় তাদের অনেক স্বজন নিহত হন এবং তারা বেদ্দাওয়িতে এসে আশ্রয় নেন।
গবেষকদের মতে, ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘নাকবা’ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং চলমান একটি প্রক্রিয়া। ফলে বাস্তুচ্যুতির এই চক্র তাদের জীবনে বারবার ফিরে আসে।
মানাল বলেন, “আমরা এখন আর নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা অনুভব করি না। জীবন ভয়ের মধ্যে কাটছে। কোথায় কখন হামলা হবে, তা কেউ জানে না।” এই পরিস্থিতিতে অনেকেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
তবে সব প্রতিকূলতার মাঝেও অনেকের মনে নিজভূমিতে ফেরার আশা এখনো জাগ্রত। এম আয়মান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমাদের সন্তানরা এখানে বড় হয়েছে, কিন্তু আমাদের ফিরে যেতে হবে আমাদের দেশ ফিলিস্তিনে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি