আন্তর্জাতিক ডেস্ক: হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগতভাবে প্রাধান্য বিস্তার করেছে ইরান। দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে গড়ে তোলা ‘ছায়া ট্যাঙ্কার বহর’ এখন তেহরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে পশ্চিমা সম্পৃক্ত জাহাজগুলো কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, আর ইরানি জাহাজগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থাকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, ইরান সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে পাল্টা কৌশল গ্রহণ করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগরে অন্তত ১৭টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে পশ্চিমা মালিকানাধীন জাহাজগুলোর বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এই জলপথে সামগ্রিক জাহাজ চলাচল কমে গেলেও ২০টির বেশি দূরপাল্লার ট্যাঙ্কার নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি জাহাজ সরাসরি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত বা ইরানের ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক নিকোলাস মুল্ডার বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরান এমন একটি প্রতিরোধী অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে, যা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক অস্ত্র—হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ—ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব থেকেও রক্ষা করছে।
ট্যাঙ্কারট্র্যাকার্স ডটকমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সমীর মাদানি জানান, যুদ্ধের মধ্যেও ইরান প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি করছে, যার বড় অংশই যাচ্ছে চীনে। যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় কম, তবুও রফতানি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
শিপিং বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইটের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও ইরানের তেল রফতানি সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চাপ তৈরি করছে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর ইরানের এই ছায়া ট্যাঙ্কার বহর পূর্ণতা পায়। বর্তমানে চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ইউয়ান ও রুবলে লেনদেন করছে। এমনকি ইরান তেলের বিনিময়ে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের মতো বিকল্প ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান এখন ইয়েমেনের হুথিদের মতো কৌশল গ্রহণ করেছে—নির্বাচিতভাবে পশ্চিমা জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং চীন-রাশিয়ার জাহাজকে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ দেওয়া। পাকিস্তান ও ভারতের জাহাজগুলোও ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপদে প্রণালি পার হয়েছে।
ম্যারিন বিশ্লেষক মিশেল উইস বকম্যানের ভাষায়, ইরান হুথিদের কৌশলকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেছে এবং পশ্চিমা জাহাজগুলোকে কার্যত দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ন্যাটো মিত্রদের সমর্থন না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি পাহারার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকলেও বিশ্ববাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব এড়ানো সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে দেশটিতে গ্যাসোলিনের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক পরাগ খান্না বলেন, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করছে—যা প্রমাণ করে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি