ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরান উভয়ই চলমান আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে এখনও মতপার্থক্য রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, অগ্রগতি হয়েছে, তবে এখনও আমাদের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে। কিছু বিষয়ে আমরা অনড়, তাদেরও কিছু লাল রেখা আছে। তবে এসব ইস্যু খুব বেশি নয়, এক-দুটি হতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে “খুব ভালো আলোচনা” চলছে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দেন, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিয়ে কোনো ধরনের “চাঁদাবাজি” মেনে নেওয়া হবে না।
মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানে শুরু হওয়া প্রায় আট সপ্তাহের যুদ্ধের মধ্যেই এই আলোচনা চলছে। সংঘাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননেও। এর মধ্যে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামও বেড়ে যায়। উল্লেখ্য, বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন করা হয়।
রোববার ভোরে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে এক সংঘর্ষে তাদের এক সেনা নিহত ও নয়জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর।
শনিবার ইরান হঠাৎ করে তাদের অবস্থান বদলে আবারও হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর বন্ধ ঘোষণা করে। এর ফলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তেহরান বলছে, মার্কিন বাহিনীর অব্যাহত নৌ অবরোধের জবাব হিসেবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে, যা তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের নৌবাহিনী শত্রুদের “নতুন তিক্ত পরাজয়” উপহার দিতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে “চাঁদাবাজি” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, চুক্তি না হলে আবারও সামরিক হামলা শুরু হতে পারে।
এর আগে শুক্রবার ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-লেবাননের মধ্যে হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে সাময়িকভাবে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও পরিবেশ রক্ষার খরচ বাবদ ফি আদায়ের অধিকার তারা প্রয়োগ করবে।
শনিবার অন্তত দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় হামলার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত সরকার দিল্লিতে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। তাদের দাবি, ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি জাহাজে গুলি চালানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর রাখছে, তবে সাম্প্রতিক ইরানি পদক্ষেপ নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়। এর বিপরীতে ইরান ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য কার্যক্রম স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ জানিয়েছেন, পরবর্তী দফা বৈঠকের কোনো তারিখ এখনও নির্ধারণ হয়নি। তিনি বলেন, আগে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
ট্রাম্প শুক্রবার দাবি করেন, দুই পক্ষ একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে এবং শিগগিরই নতুন করে আলোচনা হতে পারে।
ইসলামাবাদে আলোচনার সম্ভাবনা সামনে রেখে পাকিস্তানের রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদারের কিছু লক্ষণ দেখা গেছে, যদিও তা আগের মতো কঠোর নয়। শহরের একটি হোটেল ঘিরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও তল্লাশি চৌকি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুদ্ধ বন্ধে চাপ বাড়ছে। কংগ্রেসে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির উচ্চ মূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা তার জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
শুক্রবার প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ কমে এবং শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা যায়। তবে এখনও শত শত জাহাজ ও প্রায় ২০ হাজার নাবিক উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়ে আছে, যারা প্রণালি দিয়ে চলাচলের অপেক্ষায় রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি