ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত অপসারণ বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে এটি হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক অপারেশনগুলোর একটি।
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ধারণা করেছিল, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪১ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম খুব অল্প সময়ের মধ্যে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রা।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের এই ইউরেনিয়াম মজুত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। তবে এর জবাবে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথাও হস্তান্তর করা হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম অপসারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। ইসফাহান ও নাটাঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিমান হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক টানেল ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছে এবং কোথায় কী পরিমাণ উপাদান রয়েছে তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
প্রায় এক বছর ধরে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা এসব স্থাপনায় যেতে পারেননি। ফলে ইউরেনিয়ামের প্রকৃত অবস্থা, অবস্থান ও পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু ওয়েবারের মতে, এটি সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ইউরেনিয়াম অপসারণ অভিযান হবে।
এই অপারেশনে কর্মীদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ও অস্থিতিশীল ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় প্রবেশ করতে হবে। ইউরেনিয়াম সাধারণত ভারী সিলিন্ডারে গ্যাস আকারে সংরক্ষিত থাকে, যা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের প্রস্তাব ইতোমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছে। বিকল্প হিসেবে অন্য দেশে স্থানান্তরের আলোচনা চলছে।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময় ইরান তার ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ১১ টন ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল, যার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল। বর্তমানে অনুরূপ একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে কাজাখস্তানে অবস্থিত IAEA-নিয়ন্ত্রিত ইউরেনিয়াম ব্যাংকে তা স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত অর্থ ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের প্রস্তাবও দিতে পারে বলে জানা গেছে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি, যা বর্তমানে অনিশ্চিত।
এর আগে ১৯৯৪ সালে “প্রজেক্ট স্যাফায়ার” নামে একটি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র কাজাখস্তান থেকে প্রায় ৬০০ কেজি অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেয়। একইভাবে ১৯৯৮ সালে জর্জিয়া থেকেও ইউরেনিয়াম অপসারণ করা হয়।
তবে সেই সময় পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা ছিল। বর্তমান ইরানের ক্ষেত্রে সেই ধরনের পরিস্থিতি নেই, যা অপারেশনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরেনিয়াম অপসারণের পরও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যাচাই প্রক্রিয়া। ইরান দাবি করেছে, সাম্প্রতিক হামলায় তাদের কিছু ইউরেনিয়াম ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া এই দাবি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
যে কোনো সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে বিস্তৃত পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যার মধ্যে পরিবেশগত নমুনা সংগ্রহও থাকতে পারে। এসব নমুনার মাধ্যমে কোথাও ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব ছিল কি না তা শনাক্ত করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম অপসারণ কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক সমঝোতার অভাব এবং যাচাইয়ের জটিলতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা ছাড়া কোনো কার্যকর সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি