স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার পর পুলিশকে ধোঁকা দিতে ধর্ষণের আলামত নষ্ট করে ফেলেন আসামি সোহেল রানা। প্রথমে ছুরির আঘাতে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করেন। এরপর পানি দিয়ে ধুয়ে আলামত নষ্ট করে ফেলেন। যার কারণে শিশু রামিসার ডিএনএ টেস্টের পরও ধর্ষণের আলামত মেলেনি। তবে আলামত মুছে ফেলার বিষয়টি মামলার চার্জশিটে উঠে এসেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিষয়টি জানিয়েছেন। সোমবার ছিল মামলাটির চার্জগঠন শুনানি। ধর্ষণের পর কৌশলে ভুক্তভোগীর শরীর থেকে আলামত মুছে ফেলার বিষয়টি উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু।
শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরুর আদেশ দেন। একই সঙ্গে মামলার স্বাক্ষ্য গ্রহণের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন আদালত। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন মামলাটির বিচারকাজ চলবে। এদিকে সোমবার সকাল পৌনে ৮টায় শুনানির জন্য সোহেল ও স্বপ্নাকে কারাগার থেকে মহানগর আদালতের হাজতখানায় হাজির করা হয়। এরপর বেলা ১১টার দিকে প্রথমে সোহেল রানাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট পড়িয়ে কাঠগড়ায় নেওয়া হয়।
এসময় আসামি সোহেল রানা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বার বার বলতে থাকেন, ‘ধর্ষণ করছে ডলার। তাকে ধরেন। ধর্ষণ করছে ডলার, মারছেও ডলার। সেই কাম করছে। আমি শুধু লাশ গুম করতে চেয়েছি। কিন্তু পারিনি।’
এসময় সোহেলের কাছে ডলারের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডলারের বাসা মিরপুরের ১১ নাম্বারে। সে ধনী মানুষ।’
এছাড়া আদালতে তোলার সময় তার ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি বলেও দাবি করেন সোহেল। সোহেল বলেন, ‘আমার ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি।’
এরপর এজলাসে তোলা হয় স্বপ্নাকে। কাঠগড়ায় এসে স্বপ্না হাঁপাতে থাকেন। এরপর তার জ্যাকেট ও হেলমেট খুলে পুলিশ সদস্যরা তার মুখে পানি ঢালেন। আদালতে তোলার পর সোহেল ও স্বপ্না কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকেন। আস্তে আস্তে কথা বলতে থাকেন। সোহেল তার স্ত্রীকে অভয় দিয়ে চিন্তা না করতে বলেন।
বেলা ১১টা ৯ মিনিটে এজলাসে আসেন বিচারক। এসময় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের (সরকার নিযুক্ত) আইনজীবীরা শুনানি করতে থাকেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ দাবি করেন, আসামিরা নির্দোষ। রামিসার ডিএনএ টেস্টে আসামি সোহেলের ধর্ষণের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
এসময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, আসামি সোহেল ধর্ষণের আলামত নষ্ট করে ফেলেছে। যার কারণে টেস্টে আসেনি। শুনানির একপর্যায়ে স্বপ্নার প্রসঙ্গ আসলে সোহেলকে উদ্দেশ্য করে তার স্ত্রী বলেন, ‘বলো বলো আমি কিছু করছি?’ তখন সোহেল রানা তার স্ত্রীকে নির্দোষ দাবি করেন। নিজেও নির্দোষ দাবি করেন। তবে সোহেলকে কথা বলতে দেয়নি আদালত।
এদিকে শুনানি শেষে সোহেল ফের ধর্ষণ ও হত্যার জন্য দোষ দেন ডলার নামে একজনকে। তিনি সবার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ধর্ষণ ও হত্যা করেছে ডলার। আমি শুধু লাশ কেটেছি। মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার আমাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে।’
বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটে আসামি সোহেলকে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে নেওয়া হয়। প্রিজনভ্যানেও সোহেল বার বার চিৎকার করে বলেন, ডলার আমাকে নেশা করাইছে। সেই মেয়েটাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। আপনারা ডলারকে ধরেন। তাকে ধরলে সব পেয়ে যাবেন।’
শুনানি শেষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ বলেন, ‘ডিএনএ রিপোর্টে আসামির বীর্যের উপস্থিতি সনাক্ত হয়নি। মামলার ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী নেই। এজন্য তাদের অব্যাহতির দাবি করেছি।’
এ আইনজীবী বলেন, চার্জ শুনানিতে আদালত আমাদের কথা আমলে নেয়নি। আশা করি সাক্ষ্যপ্রমাণে ন্যায় বিচার পাবো। গণমাধ্যমে ডলারে সম্পর্কে বললেও কিছুই জানে না বলেন আসামিপক্ষের এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘আসামি সোহেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। তবে আমাকে ডলার সম্পর্কে কিছু বলেনি।’
এদিকে রামিসার ডিএনএ টেস্টে ধর্ষণের কোনো আলামত না মেলার বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘এই বিষয়ে বক্তব্য ক্লিয়ার। আসামি সোহেল ভুক্তভোগীর গোপনাঙ্গ কেটে ক্ষতবিক্ষত করে। এরপর পানি দিয়ে ধৌত করেছে। এজন্য তার শরীরে ধর্ষণে আলামত পাওয়া যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি চার্জশিটে উল্লেখ করেছেন। আমরাও আদালতে আলামত নষ্টের বিষয়টি উল্লেখ করেছি। ডলারের বিষয়ে পিপি বলেন, ‘বিচার ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এসব মিথ্যা বলছে আসামি।’
এদিকে ডিএনএ টেস্টে ধর্ষণের আলামতের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া নিপুণ বলেন, ‘ডিএনএন পরীক্ষা করতে গেলে স্থানটি শুকনা অবস্থায় লাগে। ভেজা কোনো পানির সংস্পর্শ আসলে ডিএনএ নমুনা আর থাকে না। পরীক্ষা করা তো বৃথা। যেখানে নমুনাই নাই।’ বিষয়টি চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে আট বছরের শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ফ্ল্যাটটিতে বসবাসকারী সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের কাছে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে সোহেল। গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া নিপুণ আদালতে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেন। মামলায় ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব