রিপোর্টার্স ডেস্ক: ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের (বিএএস) একটি ড্রয়ারে প্রায় ৪০ বছর ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা একটি সাধারণ দেখতে জীবাশ্মই শেষ পর্যন্ত অ্যান্টার্কটিকায় আবিষ্কৃত প্রথম ডাইনোসরের হাড় হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
জীবাশ্মটি ১৯৮৫ সালে উদ্ধার করা হলেও তখন এটি ঠিক কীসের অংশ, তা নিশ্চিত হতে পারেননি গবেষকেরা। ফলে এটি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে অবস্থিত বিএএসের ভূতাত্ত্বিক সংগ্রহশালার একটি ড্রয়ারে সংরক্ষিত ছিল।
সম্প্রতি জীবাশ্মটি নতুন করে পরীক্ষা করে জীবাশ্মবিদরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি টাইটানোসর নামের এক ধরনের ডাইনোসরের লেজের কশেরুকা (টেইল ভার্টিব্রা)।
টাইটানোসর ছিল পৃথিবীতে বিচরণ করা সবচেয়ে বৃহৎ ডাইনোসর গোষ্ঠীগুলোর একটি।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার পৃথিবীর এমন এক অঞ্চলে ডাইনোসরদের জীবনযাপন সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে, যেখানে জীবাশ্মের প্রমাণ খুবই সীমিত।
ড্রয়ার গোছাতে গিয়েই মিলল বিস্ময়
বিএএসের সংগ্রহশালা ব্যবস্থাপক ড. মার্ক ইভানস অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিভিন্ন অভিযানে আনা হাজারো নমুনা পর্যালোচনা করার সময় জীবাশ্মটির ওপর নজর দেন।
তিনি বলেন, ‘কোন ড্রয়ারে কী আছে তা খুঁজতে শুরু করলেই কখনো কখনো এমন কিছু সামনে আসে, যা দেখে মনে হয় আরে, এটি তো বেশ গুরুত্বপূর্ণ!’
জীবাশ্মটি অ্যান্টার্কটিকার জেমস রস দ্বীপ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভূতত্ত্ববিদ ড. মাইক থমসনের মাঠপর্যায়ের নোটবুকেও এর উল্লেখ রয়েছে।
১৯৮৫ সালের ৯ ডিসেম্বর তারিখের একটি ছোট্ট স্কেচের পাশে তিনি লিখেছিলেন, ‘বড় সরীসৃপের কশেরুকা’। নোটে উল্লেখ ছিল, হাড়টির প্রস্থ প্রায় ১০ সেন্টিমিটার।
ড. ইভানসের ধারণা, তখনকার গবেষকেরা এটিকে সম্ভবত কোনো সামুদ্রিক সরীসৃপের জীবাশ্ম বলে ভেবেছিলেন।
দেখেই সন্দেহ জাগে
তবে জীবাশ্মটি দেখেই ড. ইভানসের মনে হয়, এটি ডাইনোসরের হাড় হতে পারে। আবিষ্কারের সাল বিবেচনায় এটিই অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া প্রথম ডাইনোসরের জীবাশ্ম হওয়ার সম্ভাবনাও তিনি উপলব্ধি করেন।
এরপর তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করতে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিদ অধ্যাপক পল ব্যারেটের সহযোগিতা নেন। ব্যারেট বলেন, ‘দেখতে হয়তো খুব আকর্ষণীয় নয়, কিন্তু এর আকৃতি অত্যন্ত স্বতন্ত্র।’
ক্যাথেড্রালে প্রদর্শিত হচ্ছে
তিনি জানান, হাড়টির এক প্রান্তে একটি খাঁজ এবং অন্য প্রান্তে গোলাকার উঁচু অংশ রয়েছে। এ ধরনের বল-অ্যান্ড-সকেট সংযোগই কশেরুকাগুলোকে মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত যুক্ত করে।
তার ভাষায়, ‘দেখামাত্রই বুঝতে পেরেছিলাম এটি কী। এটি যে টাইটানোসরের কশেরুকা, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। এমন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় কেবল এই গোষ্ঠীর ডাইনোসরদের মধ্যেই দেখা যায়।’
ছোট আকারের টাইটানোসর?
এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে টাইটানোসরের ১০০টিরও বেশি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। এরা সবাই চার পায়ে চলা তৃণভোজী ডাইনোসর ছিল। লম্বা গলা দিয়ে গাছের উঁচু ডালপালা থেকে খাবার সংগ্রহ করত এবং ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহার করত দীর্ঘ লেজ।
সবচেয়ে বড় টাইটানোসরগুলোর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৫ মিটার (১১৫ ফুট) এবং ওজন প্রায় ৬০ টন।
তবে অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া এই কশেরুকার আকার বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, সংশ্লিষ্ট ডাইনোসরটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৭ মিটার (২৩ ফুট)।
অধ্যাপক ব্যারেট বলেন, ‘এটি হয়তো অল্পবয়সী ডাইনোসর ছিল। আবার এমনও হতে পারে, এটি পূর্ণবয়স্ক হলেও টাইটানোসরদের মধ্যে তুলনামূলক ছোট আকারের একটি প্রজাতি ছিল।’
বরফের দেশ ছিল সবুজ বনভূমি
গবেষকদের মতে, ডাইনোসরটি প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ বছর আগে, অর্থাৎ লেট ক্রিটেশিয়াস যুগে বাস করত।
তখনকার অ্যান্টার্কটিকা আজকের মতো বরফে ঢাকা ছিল না। বরং অঞ্চলটি ছিল ঘন সবুজ বনভূমিতে আচ্ছাদিত, যেখানে তৃণভোজী ডাইনোসরদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ছিল।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৯৮৫ সালের পর অ্যান্টার্কটিকায় আরও কয়েকটি ডাইনোসরের জীবাশ্ম মিলেছে, তবে সংখ্যায় সেগুলো খুবই কম।
কারণ, জীবাশ্মবিদদের জন্য অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণা অত্যন্ত কঠিন। বিশাল বরফস্তর ভূগর্ভের শিলাস্তরে লুকিয়ে থাকা প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে আড়াল করে রেখেছে।
অধ্যাপক ব্যারেট বলেন, ‘এটি প্রমাণ করে যে আজ যাকে আমরা প্রায় বসবাসের অযোগ্য অঞ্চল মনে করি, কোটি কোটি বছর আগে সেটিই ছিল প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক বাসযোগ্য ভূখণ্ড।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই আবিষ্কার আমাদের বুঝতে সাহায্য করছে, প্রায় ৮ কোটি বছর আগে পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের বাস্তুতন্ত্রে এসব ডাইনোসরের অবস্থান ও ভূমিকা কী ছিল।’
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জীবাশ্মবিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী অ্যাক্টা প্যালিওন্টোলজিকা পোলোনিকা-তে। তথ্যসূত্র: বিবিসি
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব