আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
ভারতের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা ডিরেক্টরেট অব এয়ারওয়ার্থিনেস (ডিএডব্লিউ), যাদের দায়িত্ব বিমানের কারিগরি ত্রুটি পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত নজরদারি করা। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় অনুমোদিত কর্মী পদের অর্ধেক খালি এবং অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন (ডিজিসিএ)-এর অধীনস্থ ডিরেক্টরেট অব এয়ারওয়ার্থিনেস মূলত বিমানগুলোর উড়তে উপযুক্ত অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য গঠিত।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) মান অনুসারে এয়ারওয়ার্থিনেস বলতে বোঝায়,একটি বিমান উড়ানের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ কিনা তা নিরীক্ষণ করা। ভারতীয় ডিজিসিএ নিজস্ব নিয়মপুস্তকে স্বীকার করেছে যে,ডিএডব্লিউ-এর কাজ হলো যান্ত্রিক ত্রুটি চিহ্নিত করা,সমাধানের পরামর্শ দেওয়া,বড় ধরনের সমস্যা খুঁজে বের করা এবং বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর উপর হঠাৎ ও নির্ধারিত নজরদারি চালানো।
তবে,একটি তথ্য অধিকার আইনের (আরটিআই) আওতায় করা আবেদনের উত্তরে ডিজিসিএ স্বীকার করেছে যে ডিএডব্লিউ-এর মোট ৩১০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১৩৩টি, অর্থাৎ প্রায় ৪৩ শতাংশই খালি রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো এয়ারওয়ার্থিনেস অফিসারদের পদে শূন্যতার হার। যাঁরা সরাসরি বিমানের কারিগরি নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দেখভাল করেন, সেই অফিসারদের জন্য ১২১টি পদ থাকলেও ডিজিসিএ তাতে মাত্র ৪৭ জনকে নিয়োগ দিতে পেরেছে। ফলে বাকি ৭৪টি পদ খালি, যার অর্থ দাঁড়ায় ৬১ শতাংশ শূন্যতা। ডিজিসিএ-এর দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ২০ জন এয়ারওয়ার্থিনেস অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ডিজিসিএ-র অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলি মনে করছেন, এই ধরনের শূন্যতা ডিএডব্লিউ -কে কার্যত দাঁড়িয়ে থাকা একটি থাবাহীন বাঘে পরিণত করেছে, যার মাধ্যমে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর তদারকি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ডিএডব্লিউ-এর সাবেক পরিচালক রাজেন্দ্র প্রসাদ, যিনি ২০২৩ সালের জুনে অবসর নেন, বলেন, এয়ারওয়ার্থিনেস ডিরেক্টরেট হলো বিমান নিরাপত্তার মেরুদণ্ড। এত কম জনবল দিয়ে কোনোভাবেই তাদের দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। প্রসাদ বলেন, এই পরিস্থিতি আসলে উপকারে আসছে ডিজিসিএ-র মধ্যে যারা কাজ করতে চায় না, এবং বিমান সংস্থাগুলো যারা নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কাটছাঁট করতে চায়।
এই অব্যবস্থা ডিজিসিএ-র দীর্ঘদিনের অবহেলারই অংশ, যেখানে দেখা গেছে, মোদি সরকার ধারাবাহিকভাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমিয়ে দিয়েছে। ২০২৩ও ২০২৪ অর্থবছরে যেখানে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রকের বাজেট ছিল ৩,১১৩ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা কমিয়ে আনা হয়েছে ২,৩৫৭ কোটিতে। এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো,মন্ত্রণালয়ের পুঁজিগত বরাদ্দ ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় ৯১ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই বছর আগে যেখানে এই বরাদ্দ ছিল ৭৫৫ কোটি টাকা, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭০ কোটিতে।
আরটিআই-এর মাধ্যমে ডিজিসিএ-কে ডিএডব্লিউ -এর নির্দিষ্ট বাজেট সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হলেও ডিজিসিএ জানিয়েছে যে এই তথ্য তাদের অধিক্ষেত্রে পড়ে না এবং ১০ জুলাই অন্য বিভাগে তা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার ১৯ দিন পরেও কোনো উত্তর আসেনি। ডিজিসিএ প্রধান ফয়েজ আহমেদ কিদওয়াই ও বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় রায়ের কাছেও ইমেল পাঠানো হলেও তারা কেউ সাড়া দেননি।
ডিএডব্লিউ-এর কাজ হলো নিয়মিত ও আকস্মিক উভয় ধরনের পরিদর্শন চালানো, বিমান সংস্থাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা যাচাই করা এবং তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কি না তা নিশ্চিত করা। ডিজিসিএ -র আওতাধীন ১৩টি পরিদর্শনকারী শাখার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজরদারি কাজ ডিএডব্লিউ করে থাকে। ডিজিসিএ-র ২০২৪ সালের নজরদারি পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিএডব্লিউ -এর দায়িত্ব ছিল ১,২৪৬টি পরিদর্শন করা, এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা হতে চলেছে ১,৫৯৬।
তবে ৪৩ শতাংশ পদ শূন্য থাকার কারণে, বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিদর্শনের গুণমান ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা যে সংস্থা, সেই সংস্থারই নিজস্ব পরিকাঠামো আজ এই ভয়াবহ সংকটের মুখে, যা যাত্রী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম