আর আই রফিক
গ্রামের মাতব্বরের সাথে বসে আছে হায়াত আলী। এ সময় কবির নামে এক লোক এসে হাজির।
কবির তার প্রতিবেশী বেলালের বিরুদ্ধে নালিশ করে বললো -- হুজুর, আমার পড়শী বেলাল একটা জঘন্য লোক। আমার একটা ছাগল তার ক্ষেতে গেছিলো। এতেই সে ঢিল ছুইড়া ছাগলটার ঠ্যাং ভাইঙ্যা দিছে। আমার ছাগল তার ক্ষতি কইরা থাকলে আইন মোতাবেক সে খোঁয়াড়ে পাঠাইবো। নিরিহ জন্তুর ঠ্যাং ভাঙবো ক্যান ? আমি এর কঠোর বিচার চাই।
মাতব্বর একটু ভেবে নিয়ে বললেন -- বেলালের দোষের কথা তো শুনলাম। এবার তার দুয়েকটা গুণের কথা কও তো, শুনি।
কবির বললো -- হুজুর, বেলালের মতন খারাপ মানুষ আমাদের গেরামেই নাই। তার গুণ থাকবো কইথনে ?
মাতব্বর একটু নিরব রইলেন। তাতে কবির বলে উঠলো -- হুজুর, আপনি আমাগো মা-বাপ। দয়া কইরা ওরে ডাইক্যা কঠিন শাস্তি দেন।
মাতব্বর বললেন -- ঠিক আছে যাও, এবার আর ওকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। ফের যদি অন্যায় করে, তখন আইসো।
মাতব্বরের একথায় কবিরের মন খারাপ হয়ে গেল। বিচার না পেয়ে হতাশা নিয়েই তাকে বাড়ি ফিরতে হলো।
এর কিছুক্ষণ পর জামাল এলো তার প্রতিবেশী মানিকের বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে। সে সালাম দিয়ে বললো -- হুজুর, আমারে না জানাইয়াই মানিক আমার কাঁঠাল গাছের একটা বড় ডাল কাইট্যা ফালাইছে। গায়ের জোরে এমুন কামডা করা কি তার ঠিক অইলো, আপনিই কইন ?
মাতব্বর বললেন -- একজনের গাছের ডাল আরেকজনে কাইটা ফেলানো তো অন্যায়ই।
শুনে উৎসাহিত হয়ে জামালও কবিরের মত মানিকের শাস্তি দাবী করলো।
মাতব্বর এবার জামালের কাছেও মানিকের কিছু ভালো কাজের কথা জানতে চাইলেন।
এতে জামাল বলতে লাগলো -- হুজুর, মানিক মানুষ হিসাবে খারাপ না। সে আল্লাভক্ত, বিনয়ী এবং পরোপকারী। তবে আমার গাছের ডাল কাইট্যা সে অন্যায় করেছে। আমি এর বিচার চাই।
মাতব্বর উত্তেজিত হয়ে বললেন -- হ্যা, মানিকের বিচার হবে। তুমি বাড়ি যাও। আজকেই গণ্যমান্য কয়জনকে ডেকে শালিসির ব্যবস্থা করগে। আমি আসছি। মানিকের কঠোর বিচার করা হবে।
শুনে জামাল খুশী হলো এবং সালাম জানিয়ে চলে গেলো।
হায়াত আলী দুজনের নালিশই শুধু শুনে চলছিলো। কোনো কথা বলেনি। এবার জামাল চলে গেলে বিস্ময়ের সাথে মাতব্বরকে জিজ্ঞেস করলো -- হুজুর, এটা আপনার কেমন বিচার ? কবিরের অভিযুক্ত বেলাল একজন খারাপ লোক। তার বিচার আপনি স্থগিত রাখলেন। কিন্তু জামালের অভিযুক্ত মানিক একজন ভালো মানুষ। যা জামাল নিজেই স্বীকার করলো। তবু আপনি মানিকের কঠোর বিচারের কথা বললেন !
মাতব্বর মৃদু হেসে বললেন -- আমি প্রশ্ন করে যা জানলাম, তাতে বেলাল মন্দ লোক না। বরং তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী কবিরই মন্দ লোক।
হায়াত আলী বলে উঠলো -- বেয়াদবি হলে মাফ করবেন হুজুর। কবিরকে আপনি মন্দ কিভাবে বললেন ?
মাতব্বর বললেন -- একজন মানুষ যত দোষীই হোক্, তার দুয়েকটা ভালো দিক অবশ্যই থাকে। কিন্তু মন্দ লোকেরা তাদের ভালো দিকগুলো খুঁজে পায় না। কেবল মন্দ দিকটাই দেখতে পায়। কবিরও তাই বেলালের কোনো গুণ খুঁজে পায়নি।
মাতব্বর একটু থেমে আরো বলে চললেন -- আর মানিকের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী জামাল একজন ভালো মানুষ। কারণ সে অন্যের ভালো দিকগুলোও দেখতে পায়। সে অন্যায়কে অন্যায়ই বলে, আর ন্যায়কে ন্যায়। আমার বিশ্বাস, সে মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে আসেনি।
এবার হায়াত আলী বলে উঠলো -- হুজুর, আপনি সত্যিই জ্ঞানী মানুষ এবং সুক্ষ্ম বিচারক। এজন্যই গাঁয়ের মানুষ আপনার বিচার এতো পছন্দ করে।
লেখক : কবি ও উপন্যাসিক