আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারে ক্ষমতা দখলের প্রায় পাঁচ বছর পর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করছে সামরিক জান্তা। তবে চলমান গৃহযুদ্ধ, সীমিত ভোটগ্রহণ এলাকা ও আন্তর্জাতিক অনাস্থার কারণে এই প্রচেষ্টা সফল হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত সপ্তাহে একটি সামরিক ঘাঁটি থেকে দেওয়া বক্তব্যে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, আসন্ন নির্বাচনে এমন প্রার্থীদের বেছে নিতে হবে, যারা তাতমাদাও মিয়ানমারের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তার এই বক্তব্য প্রকাশ করা হয়।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে পড়া জান্তা এখন ব্যালটের মাধ্যমে সেই নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে চাইছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। তবে কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব, কারণ দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ এখনো চলমান।
ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র মিয়ানমার উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, “পরোক্ষ সামরিক শাসনের নতুন কোনো সংস্করণ সশস্ত্র সংঘাত বা নাগরিক প্রতিরোধের অবসান ঘটাতে পারবে না। মিয়ানমার সংকটেই আটকে থাকবে।”
নির্বাচনটি তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হবে—রোববার এবং জানুয়ারিতে আরও দুটি তারিখে। তবে ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র ২৬৫টিতে ভোট হবে, যেখানে সামরিক বাহিনীর আংশিক বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় পত্রিকা গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার এক মতামত লেখায় বলেছে, পশ্চিমা মানদণ্ডে এই নির্বাচন মূল্যায়ন করা ভুল। পত্রিকাটির মতে, “এই নির্বাচন—যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক—জরুরি অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ এবং আইনি কাঠামোয় ফেরার সুযোগ।”
১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার পর থেকেই মিয়ানমারের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব প্রবল। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিন অং হ্লাইং নোবেলজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, এনএলডি নির্বাচনে জালিয়াতি করেছে—যার পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
স্বাধীন বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন বলেন, “সামরিক বাহিনী এমন কোনো পরিবর্তনে সক্ষম নয়, যা তাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলবে।”
অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। মোট ছয়টি দল সারাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যার মধ্যে সামরিক সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে এবং জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাই কিই জিন সো বলেন, ইউএসডিপির ভেতরেই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব রয়েছে। ফলে মিন অং হ্লাইং সরাসরি প্রেসিডেন্ট হবেন কি না—তা নিশ্চিত নয়। তবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি থাকবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
২০১০ সালে সামরিক তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর একজন সাবেক জেনারেল রাষ্ট্রপতি হন। পরে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন রাজনৈতিক সংস্কার শুরু করেন, যার ফলে ২০১৫ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা যথাযথ নয়।
সাউথইস্ট এশিয়া পিস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ইয়ে মিও হেইন বলেন, “সামরিক নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন স্থিতিশীলতা আনার বদলে সহিংসতা বাড়াতে পারে এবং টেকসই রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সমাধান দিতে ব্যর্থ হবে।”
চীনের সমর্থন থাকলেও জান্তা ভারত, থাইল্যান্ড ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আসিয়ান ইতোমধ্যে জান্তা নেতাদের শীর্ষ বৈঠকে নিষিদ্ধ করেছে।
জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা ও পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে মানতে নারাজ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিটেন বলেছে, “সহিংসতার অবসান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ ছাড়া কোনো অর্থবহ নির্বাচন সম্ভব নয়।”
জান্তা অবশ্য দাবি করছে, জনগণের সমর্থনেই নির্বাচন হচ্ছে। জান্তা মুখপাত্র জও মিন তুন বলেন, এই নির্বাচন মিয়ানমারের জনগণের জন্য, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সন্তুষ্টির জন্য নয়।
রয়টার্স/রিপোর্টার্স২৪/এসসি