স্টাফ রিপোর্টার: সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে আটক জেলেদের উদ্ধারে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন নিখোঁজদের পরিবার। তাঁদের অভিযোগ, গত পাঁচ মাসে টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন এলাকার অন্তত ৪২০ জন জেলেকে বাংলাদেশের জলসীমা থেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। কিন্তু তাঁদের উদ্ধারে সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত ‘দ্বীপের নারীরা: সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্য একটি পরিবেশগত নারীবাদের দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স নামের একটি সংগঠন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সেন্ট মার্টিন থেকে ঢাকায় আসেন হুমায়রা বেগম ও রাবেয়া বেগম। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মাছ ধরতে গিয়ে তাঁদের স্বামীদের অপহরণ করে আরাকান আর্মি। প্রায় পাঁচ মাস ধরে স্বামীদের কোনো খোঁজ পাননি বলে জানান তাঁরা।
স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হুমায়রা বেগম। তিনি বলেন, পাঁচ মাস ধরে জানি না, আমার স্বামী বেঁচে আছে কি না। দুই সন্তান নিয়ে আধপেটা খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। তার ওপর দাদনের ঋণের চাপ। স্বামীকে উদ্ধারে সরকারের জোরালো উদ্যোগ চান তিনি।
রাবেয়া বেগম বলেন, নিজের দেশের জলসীমার মধ্যেও এখন মাছ ধরা নিরাপদ নয়। আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আর সরকার নিরাপত্তা দিতে পারছে না। দ্রুত আমার স্বামীকে উদ্ধারের ব্যবস্থা নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নিখোঁজ দুই জেলের মা মদিনা বেগম। তিনি বলেন, কৈশোরে স্বামী হারিয়ে দুই ছেলেকে কষ্ট করে বড় করেছেন। আজ তারা আরাকান আর্মির হাতে বন্দী। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, মরার আগে যেন সন্তানদের মুখ দেখে যেতে পারি, বলেন তিনি।
সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা মো. যোবায়ের বলেন, দ্বীপের মানুষের প্রধান জীবিকা মাছ ধরা হলেও এখন সেই পেশাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি অভিযোগ করেন, আমাদের জলসীমা থেকেই জেলেদের অপহরণ করা হচ্ছে, কিন্তু সরকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না।
অনুষ্ঠানে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু বলেন, আরাকান আর্মির হাতে চার শতাধিক জেলে আটক হওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে কোনো কার্যকর প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘বিএসএফের হাতে এতজন জেলে আটক হলে দেশজুড়ে আন্দোলন হতো। কিন্তু এখানে নীরবতা আমাদের ব্যর্থতারই প্রমাণ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, সমুদ্রসীমা অর্জন হলেও জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। কাঠামোগত বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা ভবিষ্যতে আরও সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, নিখোঁজ পরিবারগুলো অন্তত জানতে চায় তাদের স্বজনেরা বেঁচে আছেন কি না। রাষ্ট্র সেটুকুও নিশ্চিত করতে পারছে না।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের গবেষক সামিরা আহমদ বলেন, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নয়, সেন্ট মার্টিনকে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে দেখতে হবে। নচেৎ দ্বীপের বাসিন্দারা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল স্টাডিজের প্রদায়ক শৈলি আখন্দ।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি