আতিয়ার রহমান: পৃথিবীর ঘূর্ণনগতি ধীরে ধীরে কমে আসছে, ফলে দিনগুলো ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে—সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই চমকপ্রদ তথ্য। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইটিএইচ জুরিখ-এর গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই পরিবর্তন ঘটছে অভূতপূর্ব গতিতে এবং এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন।
গত ১৩ মার্চ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য প্রতি শতাব্দীতে প্রায় ১.৩৩ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে। গত ৩৬ লাখ বছরের ইতিহাসে এই পরিবর্তনের হার এত দ্রুত আর কখনো দেখা যায়নি। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ ও হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এই গলিত পানি বিষুবরেখার দিকে ছড়িয়ে পড়ায় পৃথিবীর ভরের বিন্যাস পরিবর্তিত হচ্ছে, যা সরাসরি ঘূর্ণনগতিকে প্রভাবিত করছে।
বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে একজন ফিগার স্কেটারের উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন একজন নৃত্যশিল্পী ঘোরার সময় হাত ছড়িয়ে দিলে তার ঘূর্ণনগতি কমে যায়, তেমনি পৃথিবীর ভর অক্ষ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় এর ঘূর্ণনও ধীর হয়ে পড়ছে।
গবেষণার অন্যতম গবেষক, বেনেডিক্ট সোজা বলেন, “অতীতের প্রাকৃতিক চক্রে পরিবর্তন ঘটলেও ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যে দ্রুততা দেখা গেছে, তা একেবারেই ব্যতিক্রম। প্রায় ২০ লাখ বছর আগে একবার এই হার বর্তমানের কাছাকাছি ছিল, কিন্তু এবারকার মতো এত দ্রুত পরিবর্তন আগে কখনো ঘটেনি।” তিনি আরও জানান, এক মিলিসেকেন্ডের ক্ষুদ্র পরিবর্তন সাধারণ মানুষের কাছে তুচ্ছ মনে হলেও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাশযানের গতিপথ নির্ধারণ, স্যাটেলাইট নেভিগেশন এবং বিশ্বব্যাপী সময় নির্ধারণে ব্যবহৃত পারমাণবিক ঘড়ির নির্ভুলতা—সব ক্ষেত্রেই এই সূক্ষ্ম সময় পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণায় অতীতের দিনগুলোর দৈর্ঘ্য নির্ধারণে বিজ্ঞানীরা “বেন্থিক ফোরামিনিফেরা” নামক এককোষী সামুদ্রিক জীবের জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করেছেন। এই জীবের খোলসের রাসায়নিক গঠন থেকে অতীতের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পরে এই তথ্য ফিজিক্স-ইনফর্মড মেশিন লার্নিং মডেলে প্রয়োগ করে গত কয়েক মিলিয়ন বছরের দিনের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রায় ২০ লাখ বছর আগে যখন গ্রিনল্যান্ড বরফমুক্ত ও বনাচ্ছন্ন ছিল, তখনও পৃথিবীর ঘূর্ণন কিছুটা ধীর হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ২৫ বছরে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা অতীতের যেকোনো প্রাকৃতিক পরিবর্তনের তুলনায় কয়েকগুণ দ্রুত।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ২১ শতকের শেষভাগে, বিশেষ করে ২০৮০-এর দশক থেকে, দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাবকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সে সময় প্রতি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য ২.৬২ মিলিসেকেন্ড পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এই গবেষণা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু আবহাওয়া বা পরিবেশ নয়—পৃথিবীর মৌলিক ভৌত বৈশিষ্ট্যেও গভীর প্রভাব ফেলছে, যা ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও মানবজীবনের নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।