ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এর পরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
সোমবার (১ জুন) ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, লেবাননে ইসরাইলি হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা বার্তা আদান-প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলারের বেশি বেড়ে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দেয়। এর মধ্যে লেবানন ফ্রন্টে ইসরাইলের নতুন সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, কোনো একটি ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন মানে সব ফ্রন্টেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন। তিনি এ পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেন।
তাসনিমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান ও তাদের মিত্র ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। পাশাপাশি ইয়েমেন উপকূলের কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালীকেও নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে গত সপ্তাহে দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বিমান হামলার পর সোমবার কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ছোড়া দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ভূপাতিত করা হয়েছে এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। হামলার পর কুয়েত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।
তবে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরান এখনো একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। একই সঙ্গে তিনি সমালোচকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করছে এবং নতুন নতুন শর্ত সামনে আনছে, যা আলোচনার পথকে আরও দীর্ঘ ও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান মতপার্থক্যের কেন্দ্রে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের আটকে থাকা তেল রাজস্ব ফেরত দেওয়া এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করার বিষয়গুলো। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের প্রধান উদ্বেগ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।
এদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের নতুন সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সোমবারও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন, তবু ইরানের আলোচনা স্থগিতের সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব