রিপোর্টার্স ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: কম্বোডিয়ার শক্তিশালী প্রাক্তন নেতার সাথে ফাঁস হওয়া ফোনকলের জন্য মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে দেশটির সাংবিধানিক আদালত।
মঙ্গলবার (১ জুলাই) থাইল্যান্ডের নয় সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চের সাতজন বিচারক নৈতিক লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে নিয়ে এই আদেশ দেন। আদালত পেতংতার্নকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ১৫ দিনের সময় দিয়েছে।
৩৮ বছর বয়সী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা তার পূর্বসূরিকে পদ থেকে অপসারণের পর মাত্র ১০ মাস প্রধানমন্ত্রীর পদ ধরে রেখেছেন। তার বরখাস্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা এনেছে, যা বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নেতৃত্বের পরিবর্তনের কারণে বিপর্যস্ত।
প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর পেতংতার্ন সাংবাদিকদের বলেন, “আদালতের রায় আমি মেনে নিয়েছি। আমি সব সময় আমার দেশের জন্য সর্বোত্তম কাজ করার চেষ্টা করেছি।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও ঘনীভূত করবে। থামাসাত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিশ্লেষক পুরাবিচ ওয়াতানাসুক বলেন, “আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন। তবে এই অনিশ্চয়তার কারণে সরকারের স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হতে পারে।”
প্রত্যাশা করা হচ্ছে, উপপ্রধানমন্ত্রী সুরিয়া জুনগ্রুংরুয়াংকিত ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে পারেন। যদিও এখনো সরকারিভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
এর আগে ২০২৪ সালে একই আদালত প্রধানমন্ত্রী স্রেথা থাভিসিনকে অনুরূপ অভিযোগে বরখাস্ত করেছিল। থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই রাজতান্ত্রিক অভিজাত মহলের স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ রয়েছে।
পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মে মাসে ফাঁস হওয়া একটি ফোনালাপ। ওই ফোনালাপে তাকে কম্বোডিয়ার সিনেট প্রেসিডেন্ট হুনসেনের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে নিহত এক কম্বোডীয় সেনার বিষয়ে কূটনৈতিক আলোচনা করতে শোনা যায়। এছাড়া ফোনালাপে তিনি থাই সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে নিয়ে সমালোচনা করেন, যা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
এই ঘটনার পর রাজধানী ব্যাংককে হাজার হাজার মানুষ সড়কে নেমে পেতংতার্নের পদত্যাগ দাবি করে।
পেতংতার্নের বিরুদ্ধে আরও একটি নৈতিক লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করছে থাইল্যান্ডের জাতীয় দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও বিপন্ন হতে পারে।
অন্যদিকে গতকাল ব্যাংককের একটি আদালতে হাজির হয়েছেন পেতংতার্নের পিতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার এক সংবাদমাধ্যমে রাজতন্ত্র নিয়ে মন্তব্য করার কারণে তার বিরুদ্ধে রাজা-অপমানবিষয়ক আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক থিতিনান পংসুদিরাক মনে করেন, “এই দুটি মামলার মধ্যে অস্বীকার করা যায় না এমন সংযোগ রয়েছে। সিনাওয়াত্রা পরিবার এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি।”
এই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই রাজা মহা বজিরালংকর্ণ পেতংতার্নের প্রস্তাবিত নতুন মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছেন। ফোনালাপ কেলেঙ্কারির জেরে ক্ষমতাসীন জোটের একটি বড় দল সরে গেলে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। বরখাস্ত হওয়ার আগে পেতংতার্ন নিজেই সংস্কৃতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় মন্ত্রিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনা থাইল্যান্ডের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এখন সকলের নজর আদালতের চূড়ান্ত রায়ের দিকে।
রিপোর্টার্স২৪/আরএইচ