রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক : সিরিয়ার সাবেক শাসক বাশার আল-আসাদের সরকার ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে একটি গোপন অভিযানে কুতাইফা এলাকায় অবস্থিত বিশাল গণকবর থেকে হাজার হাজার মৃতদেহ দামেস্কের পূর্বাঞ্চলের মরুভূমিতে একটি গোপন স্থানে সরিয়ে নিয়ে গেছে । এই ‘গোপন পুনঃসমাধি অভিযান’-এর উদ্দেশ্য ছিল গণহত্যার প্রমাণ মুছে ফেলা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আসাদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করা।
বুধবার (১৫ অক্টোবর) রয়টার্সের একটি অনুসন্ধানে এই তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আসাদের সেনাবাহিনী অপারেশন মুভ আর্থ (Operation Move Earth) নামে দুই বছরব্যাপী এক গোপন অভিযানে কুতাইফা গণকবর খনন করে সেখানে থাকা মৃতদেহগুলো ট্রাকে করে দামির শহরের বাইরে মরুভূমিতে নিয়ে যায়। এই নতুন স্থানে তারা আরেকটি বিশাল গণকবর তৈরি করে। ঘটনাটি এর আগে কখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
রয়টার্স এই অভিযান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছে এমন ১৩ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তৈরি করা নথিপত্র পরীক্ষা করে এবং কয়েক বছরের স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণ করে। সব মিলিয়ে দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি সপ্তাহে চার রাত ধরে ৬ থেকে ৮টি ট্রাক কুতাইফা থেকে মৃতদেহ ও মাটি বহন করে দামির মরুভূমির ওই গোপন স্থানে যেত।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুতাইফা গণকবরে ছিল ১৬টি লম্বা খাল, যার দৈর্ঘ্য ১৫ মিটার থেকে ১৬০ মিটার পর্যন্ত। আর দামির মরুভূমির নতুন গণকবরে কমপক্ষে ৩৪টি খাল রয়েছে, প্রতিটির দৈর্ঘ্য ২০ মিটার থেকে ১২৫ মিটার পর্যন্ত। ধারণা করা হয়, নতুন এই স্থানে কয়েক হাজার মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে।
এই গণকবরের প্রথমটি, অর্থাৎ কুতাইফার কবরস্থানটি গঠিত হয় ২০১২ সালের দিকে, যখন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এখানে সমাহিত ছিল সেনাসদস্য, বন্দী ও সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণকারীদের দেহ।
২০১৪ সালে এক সিরীয় মানবাধিকার কর্মী স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এর ছবি প্রকাশ করলে গণকবরটির অস্তিত্ব প্রথম প্রকাশ্যে আসে।
গোপন অভিযানে জড়িত কয়েকজন ট্রাকচালক, যন্ত্রচালক ও আসাদের রিপাবলিকান গার্ডের এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, সামরিক কমান্ডারদের নির্দেশ ছিল কুতাইফা গণকবর থেকে সব দেহ সরিয়ে ফেলতে এবং হত্যার প্রমাণ মুছে ফেলতে।
অন্য এক ট্রাকচালক বলেন, এই আদেশ অমান্য করার মানেই মৃত্যু। আপনি নিজেই হয়তো সেই গর্তে পড়ে যেতেন। সাবেক রিপাবলিকান গার্ড কর্মকর্তা জানান, মৃতদেহ সরানোর পরিকল্পনা করা হয় ২০১৮ সালের শেষের দিকে, যখন আসাদ গৃহযুদ্ধে প্রায় বিজয়ী অবস্থানে ছিলেন। তখন তার লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পুনরুদ্ধার করা, কারণ নিষেধাজ্ঞা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন ছিলেন।
রয়টার্স আরও জানায়, আসাদের পতনের আগেই কুতাইফার ১৬টি খালই খালি করে ফেলা হয়। সিরীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, আসাদের শাসনামলে ১ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হন, যারা সম্ভবত দেশজুড়ে তৈরি ডজনখানেক গণকবরে সমাহিত আছেন।
দেশের বর্তমান সরকার ডিসেম্বর মাসে আসাদবিরোধী বাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও এসব গণকবর থেকে কারা কোথায় সমাহিত হয়েছেন সে বিষয়ে কোনো নথি প্রকাশ করেনি।
সিরিয়ার জরুরি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী রায়েদ আল-সালেহ জানিয়েছেন, বিপুল সংখ্যক নিহত ও ন্যায়বিচার পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া ধীরগতি হওয়ায় কাজটি জটিল হয়ে পড়েছে। সরকার ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর মিসিং পিপল’নামে নতুন একটি সংস্থা গঠন করেছে, যা নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ডিএনএ ব্যাংক ও ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে।
আল-সালেহ আরও বলেন, যতদিন মায়েরা ছেলের কবর খুঁজছেন, স্ত্রী স্বামীর কবর খুঁজছেন, সন্তানরা বাবার কবর খুঁজছে, ততদিন এই ক্ষত রক্তাক্ত থাকবে। সিরিয়া জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি সেন্টারের প্রধান মোহাম্মদ আল আবদাল্লাহ বলেন, এভাবে মৃতদেহ গোপনে স্থানান্তর করা শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য ভয়াবহ আঘাত। তিনি নতুন সরকারের নেওয়া নিখোঁজদের সন্ধান কমিশনকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও বলেন, রাজনৈতিক সমর্থন থাকলেও প্রয়োজনীয় সম্পদ ও বিশেষজ্ঞের ঘাটতিরয়েছে। আসাদ সরকারের এই গোপন অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে শিগগিরই আরেকটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে বলেও জানিয়েছে রয়টার্স।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম