রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক : বাংলাদেশে গত এক সপ্তাহে বারবার ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যে ২৬ নভেম্বর রাতে বঙ্গোপসাগরে চার মাত্রার একটি ভূমিকম্প এবং পরদিন ইন্দোনেশিয়ায় ৬ দশমিক ৬ মাত্রার কম্পন পরিস্থিতিকে আরও আলোচনায় এনেছে। যদিও এসব ঘটনায় বড় কোনো সুনামির আশঙ্কা দেখা যায়নি, তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন। ইন্দোনেশিয়া, আন্দামান-নিকোবর বা আরাকান উপকূলে বড় মাত্রার কম্পন হলে বাংলাদেশও সুনামির ঝুঁকির বাইরে নয়। খবর—বিবিসি।
২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামির উদাহরণ এখনও বিশ্ববাসীর স্মৃতিতে তাজা। ইন্দোনেশিয়ার ৯ দশমিক ১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে দুই লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ঐ সুনামির ঢেউ আফ্রিকা পর্যন্ত গিয়ে আঘাত করে। বাংলাদেশেও এর অভিঘাতে দুইজনের মৃত্যুর ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে।
কখন সুনামির ঝুঁকি তৈরি হয়?
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, সাগরে যদি ভূমিকম্পের মাত্রা ৬ দশমিক ৫-এর ওপরে যায়, তবে সুনামির সম্ভাবনা আছে কিনা তা সুনামি সার্ভিস প্রোভাইডাররা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এর মধ্যে পানির উচ্চতা, ঢেউয়ের দিক ও কোন এলাকায় কী পরিমাণ আঘাত হানতে পারে। এসব বিষয় তারা ক্রমাগত মূল্যায়ন করেন।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে প্রায়ই ছোট মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে। চার মাত্রা বা তার নিচের কম্পনে ক্ষতির আশঙ্কা নেই বললেই চলে। তবে শক্তিশালী উপকূলীয় কম্পন হলে সুনামির ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও যদি বড় ভূমিকম্প হয়, তবুও উপকূলীয় এলাকায় পানির চাপ এবং ভূমির গঠনের কারণে সুনামির মতো তরঙ্গ তৈরি হতে পারে।
সমুদ্রের নিচে কেন ভূমিকম্প হয়?
পৃথিবীর ভূত্বক অনেকগুলো টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট একে অপরকে ঠেলে, পাশ কাটিয়ে বা উপর-নিচে সরতে থাকে। এই গতিবিধিতেই ভূমিকম্প ঘটে। যেখানেই এই প্লেটগুলোর সংঘর্ষ বা স্লাইডিং ঘটে—সেটি ভূমিতে হোক বা সমুদ্রতলে। তীব্র কম্পন সৃষ্টি করতে পারে।
২৪-২৮ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সব মহাদেশ একক ভূখণ্ড প্যাঞ্জিয়ার অংশ ছিল—এমন তত্ত্ব ভূবিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন। টেকটনিক প্লেটের সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেই আজকের বিচ্ছিন্ন মহাদেশগুলোর জন্ম। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রতল পর্বতশ্রেণি মিড-অ্যাটলান্টিক রিজ তার অন্যতম প্রমাণ; যার ৯০ শতাংশ পানির নিচে, আর বাকি অংশ আইসল্যান্ডে দৃশ্যমান।
সুনামি কীভাবে জন্ম নেয়?
সুনামি সাধারণ জলোচ্ছ্বাস নয়, এটি বিশাল জলরাশির হঠাৎ স্থানচ্যুতির ফল। সমুদ্রতলে যদি শক্তিশালী ভূমিকম্প অগভীর স্থানে ঘটে এবং তলদেশকে ওপর-নিচ করে নেড়ে দেয়, তখন অস্বাভাবিক উচ্চতার ঢেউ সৃষ্টি হয়। এই ঢেউ ক্রমেই শক্তি সঞ্চয় করে উপকূলের দিকে এগোয় এবং সুনামিতে রূপ নেয়।
বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে?
বিশ্বে সুনামির সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হলো প্রশান্ত মহাসাগরের রিং অব ফায়ার। বড় সুনামি সৃষ্টিকারী সাবডাকশন জোনগুলো বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক দূরে। তবে বাংলাদেশ চট্টগ্রাম-আরাকান হয়ে আন্দামান পর্যন্ত বিস্তৃত দুই বড় প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় ঝুঁকি পুরোপুরি নেই বলা যায় না।
আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা বলেন, সাধারণভাবে ভূমিকম্প থেকে বিপুল সুনামির আশঙ্কা নেই। তবে আন্দামান-নিকোবর অঞ্চলে বড় কম্পন হলে সেটা আমাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আমরা নিয়মিত টেস্ট মোডে মনিটরিং করি।
ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, ১৯৬২ সালে আরাকান উপকূলে সাড়ে আট মাত্রার ভূমিকম্প থেকে বড় সুনামি হয়েছিল, যার ঢেউ বাংলাদেশ উপকূল পর্যন্ত পৌঁছায় এবং ঢাকায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ অঞ্চলে একবার বড় ভূমিকম্প হওয়ার পর আবার এমন কম্পন ঘটতে সাধারণত ৫০০ থেকে ৯০০ বছর সময় লাগে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে একই মাত্রার বড় কম্পন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশ কেন বেশি স্পর্শকাতর?
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের গঠন ফানেল আকৃতির দক্ষিণে খোলা সমুদ্র এবং উত্তর-দক্ষিণে সংকুচিত ভূখণ্ড। ফলে আন্দামান বা ভারত মহাসাগরে বড় সুনামি হলে তার ঢেউ বাংলাদেশের দিকে দুর্বল হয়ে আসলেও আঘাত লাগতেই পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প আগে থেকে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব না হলেও সুনামির ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করার সময় পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় হুমকি সরাসরি সমুদ্র নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম