চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা নিয়ে মন্তব্যের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এতে আট ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন সহ–উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, সহ–উপাচার্য (প্রশাসনিক) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে প্রশাসনিক ভবনের সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন ছয়টি ছাত্রসংগঠনের নেতা–কর্মী ও শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় সহ–উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের পদত্যাগ করতে হবে।
রাত আটটার দিকে প্রশাসনিক ভবন ঘিরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা পৃথক অবস্থান নিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি স্লোগানে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এ সময় প্রশাসনিক ভবনের এক পাশে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা। অন্যদিকে প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা দিয়ে অবস্থান করেন শাখা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, নারী অঙ্গন, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা–কর্মীরা। একই সঙ্গে চাকসুর প্রতিনিধিরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন।
কর্মসূচি চলাকালে ছাত্রদল ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতা–কর্মীরা স্লোগান দেন‘এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়, জামায়াত-শিবির রাজাকার’, ‘দফা এক দাবি এক, শামীম স্যারের পদত্যাগ’। অপরদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা স্লোগান দেন‘হিন্দুস্তানি দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান,‘ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও সহকারী প্রক্টর মো. নুরুল হামিদের হস্তক্ষেপে পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মুহাম্মদ পারভেজ অভিযোগ করে বলেন, ‘ছাত্রদল ও কিছু বামপন্থী সংগঠন সহ–উপাচার্যের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তালা দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে এটি চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, যা অতীতে ছাত্রলীগ করত।’
এ অভিযোগ অস্বীকার করে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন বলেন, ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনা সভায় সহ–উপাচার্য (একাডেমিক) মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এই বক্তব্য জাতির জন্য অবমাননাকর। এর প্রতিবাদেই আমরা আন্দোলনে নেমেছি। প্রশাসন এখন ছাত্রলীগের পরিবর্তে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ব্যবহার করছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মো. নুরুল হামিদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত পরিবেশ রক্ষায় সব সংগঠনের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কাউকে জোর করে আটকে রাখা হয়নি।’
প্রসঙ্গত, রোববার (১৪ ডিসেম্বর) শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সহ–উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ‘অবান্তর’ বলে মন্তব্য করেন, যা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
এ সময় তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশকে করদরাজ্যে পরিণত করার লক্ষ্যেই বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেলে ১৯৭১ সালের ইতিহাস আরও স্পষ্ট হতো। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এ বক্তব্যের প্রতিবাদে রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর থেকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন ছাত্রদল ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতা–কর্মীরা। তারা সহ–উপাচার্যকে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগের আহ্বান জানান।
এদিকে ঘটনার পর সোমবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, সহ–উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের বক্তব্যের কিছু অংশ খণ্ডিতভাবে প্রচারিত হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড অস্বীকার করেননি; বরং হত্যার পরিকল্পনা ও প্রকৃতি নিয়ে আরও প্রামাণ্য গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি