| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ক্ষমতা, কারাগার ও নীরব সংগ্রাম: বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ অধ্যায়

reporter
  • আপডেট টাইম: ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫ ইং | ৬:৪৩:৫৮:অপরাহ্ন  |  113116 বার পঠিত
ক্ষমতা, কারাগার ও নীরব সংগ্রাম: বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ অধ্যায়
ছবির ক্যাপশন: শাহানুজ্জামান টিটু

শাহানুজ্জামান টিটু

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের জীবন কেবল ক্ষমতার শীর্ষে ওঠানামার গল্প নয়—বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবাধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন। গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আবার দীর্ঘদিনের কারাবন্দী রাজনীতিক—এই তিনটি পরিচয়ই তাঁর জীবনে বাস্তব।

এই লেখা খালেদা জিয়াকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষ, একজন নারী এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করা এক নাগরিক হিসেবে দেখার একটি প্রয়াস।

ইতিহাসের ভেতর একজন নারী

খালেদা জিয়া (পূর্ণ নাম: খালেদা জিয়া উর রহমান) জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের আগস্টে, দিনাজপুর জেলায়। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ পারিবারিক উত্তরাধিকার ছিল না।

১৯৫৯ সালে তিনি সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ সময় তাঁর জীবন আবর্তিত হয়েছে সংসার, সন্তান ও পারিবারিক দায়িত্বকে ঘিরে। রাজনীতির মঞ্চ তখন তাঁর জগৎ ছিল না।

১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধ ও নীরব বন্দিদশা

মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। তিনি অস্ত্র ধরেননি, নেতৃত্ব দেননি—তবু যুদ্ধ তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নজরদারিতে গৃহবন্দী ছিলেন। স্বামীর অনুপস্থিতি, সন্তানদের নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা—এই ছিল তাঁর যুদ্ধ। এটি কোনো বীরত্বগাথা নয়; বরং যুদ্ধের ভেতরে আটকে পড়া এক সাধারণ নারীর নীরব মানসিক সংগ্রাম।

রাজনীতিতে অনিচ্ছাকৃত প্রবেশ

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার জীবন আমূল বদলে যায়। ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়েই তিনি রাজনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন। রাজনীতি তখন তাঁর কাছে কেবল আদর্শের বিষয় ছিল না; এটি হয়ে ওঠে টিকে থাকার লড়াই।

১৯৯১: প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করে। একই সঙ্গে ইতিহাস গড়ে বেগম খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।এই মেয়াদে উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ ছিল—সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা,বেসরকারিকরণ ও শিল্পায়নের সূচনা,প্রাথমিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি, ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়–পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম। বিশ্ব রাজনীতিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একজন নারী সরকারপ্রধান তখনো ছিল বিরল ঘটনা।

২০০১–২০০৬: ক্ষমতার শিখর ও বিতর্ক

২০০১ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে তাঁর সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, বেসরকারি খাত ও টেলিযোগাযোগে অগ্রগতির দাবি করে।তবে একই সময়ে বাড়তে থাকে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিরোধীদের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ। ২০০৬ সালে মেয়াদ শেষে ক্ষমতা ছাড়লেও রাজনৈতিক অস্থিরতা থামেনি।

কারাগার ও মানবাধিকার প্রশ্ন

২০০৭ সালের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি মামলা হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।বয়স, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক পরিচয়—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর দীর্ঘ কারাবাস দেশে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করে। খালেদা জিয়া এসব মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে উল্লেখ করেন।

তাঁর চিকিৎসা সংকট, সীমিত মুক্তি ও দীর্ঘ বন্দিদশা একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে—একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রবীণ নাগরিকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কতটা মানবিক ও দায়িত্বশীল ছিল?

‘Battle of Begums’: ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, রাষ্ট্রীয় বিভাজন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বাংলাদেশকে কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত করেছে। এটি কেবল দুই নারীর ব্যক্তিগত লড়াই নয়; বরং ইতিহাস, ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় স্মৃতির সংঘাত। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই দ্বৈরথে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি বহুবার দুর্বল হয়েছে।

উপসংহার: আলো-ছায়ার জীবন

খালেদা জিয়া নিখুঁত নন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ভুলও রয়েছে। আবার তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী,সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ,এবং দীর্ঘ অসুস্থতা ও কারাবাস সত্ত্বেও দেশত্যাগ না করা এক রাজনৈতিক চরিত্র।তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—ইতিহাস কখনো সাদা বা কালো নয়। ইতিহাস গড়ে ওঠে মানুষ, ভুল, সাহস, ক্ষমতা ও যন্ত্রণার সমষ্টিতে।একজন নারী হিসেবে, একজন রাজনীতিক হিসেবে—বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ অধ্যায়।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪