| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বাংলাদেশে আতঙ্কে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা: আল জাজিরা

reporter
  • আপডেট টাইম: জানুয়ারী ১৩, ২০২৬ ইং | ১৫:২৩:৩৬:অপরাহ্ন  |  ৯৭৩৯২৪ বার পঠিত
বাংলাদেশে আতঙ্কে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা: আল জাজিরা
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত ছবি

রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী মনোভাবের মধ্যে দেশটিতে অধ্যয়নরত হাজারো ভারতীয় শিক্ষার্থী, বিশেষ করে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা, নিজেদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের কাছে বাংলাদেশে থাকা এখন ‘একটি দুঃস্বপ্নে’ পরিণত হয়েছে।

ঢাকার উপকণ্ঠে ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের ছাত্র করিম (ছদ্মনাম) প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নিজের হোস্টেল কক্ষে নিজেকে বন্দি করে রাখেন। দরজায় কেউ কড়া নাড়লে আগে পরিচিত কণ্ঠ কি না তা নিশ্চিত করেন। বাইরে গেলে ভিড় এড়িয়ে চলেন, বাজার বা চায়ের দোকানে যাওয়া বন্ধ করেছেন। বাংলা ভাষায় সাবলীল না হওয়ায় তার ভারতীয় পরিচয় ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের হরিয়ানা থেকে বাংলাদেশে আসেন করিম। ভারতে সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন না পেয়ে তুলনামূলক কম খরচের কারণে তিনি বাংলাদেশকে বেছে নেন। শুরুতে ঢাকা তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, রেস্তোরাঁয় খাওয়া সবই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

আন্দোলন, সহিংসতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের পর থেকেই ভারতীয় শিক্ষার্থীদের চলাফেরা সীমিত করে দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। করিমের ভাষায়, যে শহর একসময় দ্বিতীয় বাড়ির মতো ছিল, এখন সেটাই ভয় আর অনিশ্চয়তার জায়গা।

৯ হাজারের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী উদ্বেগে

বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ৯ হাজারের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন।

শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরও ভারত তাকে ফেরত না দেওয়ায় বাংলাদেশে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ ভারতীয় শিক্ষার্থী সমাজের ওপর।

গত ১৯ ডিসেম্বর ঢাকার বাইরে ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের এক ভারতীয় ছাত্র স্থানীয় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। তার মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন ভৈভব (ছদ্মনাম) বলেন,‘প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। একসময় নির্ভয়ে শহর ঘুরেছি, এখন হাসপাতালের ভেতরেও কথা বলার সময় সাবধান থাকতে হয়।’

তিনি জানান, এখন প্রকাশ্যে নিজের ভারতীয় পরিচয় গোপন রাখেন। ‘একটা ভুল শব্দই বিপদের কারণ হতে পারে,’ বলেন তিনি।

বাংলাদেশ কেন শিক্ষার্থীদের পছন্দ

প্রতি বছর ভারতে দুই কোটির বেশি শিক্ষার্থী মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেও সরকারি কলেজে আসন থাকে ৬০ হাজারেরও কম। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের উচ্চ ফি অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে। সেখানে বাংলাদেশে একটি পূর্ণ মেডিকেল কোর্সে খরচ পড়ে প্রায় ৩৮ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ডলার, যা তুলনামূলকভাবে কম।

এই কারণে বহু ভারতীয় পরিবার সর্বস্ব দিয়ে সন্তানদের বাংলাদেশে পাঠান। কিন্তু চলমান অস্থিরতায় সেই সিদ্ধান্ত এখন অনেকের কাছেই আতঙ্কের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা ও সহিংসতা

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, ভারতবিরোধী স্লোগান ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন। ডিসেম্বর মাসে এক ছাত্রনেতা হত্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এরপর সংখ্যালঘু নির্যাতন ও কূটনৈতিক মিশনের সামনে বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদ অবশ্য দাবি করেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

তবে ভারতের অল ইন্ডিয়া মেডিকেল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AIMSA) জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে অধ্যয়নরত ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শতাধিক সাহায্যের আবেদন পেয়েছে। সংগঠনটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রয়োজনে তাদের সরিয়ে আনার কথাও বলেছে।

ডিগ্রি ঝুলে আছে অনিশ্চয়তায়

কোভিড-১৯ মহামারির পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় বহু শিক্ষার্থীর পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কাশ্মীরের বাসিন্দা মোহাম্মদ (ছদ্মনাম), যিনি ২০১৮ সালে ভর্তি হয়েছিলেন, বলেন ২০২৪ সালে তার ডিগ্রি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আন্দোলন, পরীক্ষা স্থগিত ও ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় এখনো তিনি অনিশ্চয়তায় আটকে আছেন। ‘প্রথমে করোনা, তারপর রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন শুধু অপেক্ষা ছাড়া কিছু করার নেই, বলেন তিনি।

বর্তমানে অনেক কলেজে হোস্টেল কারফিউ কঠোর করা হয়েছে। আগে রাত ১০টায় গেট বন্ধ হলেও এখন সন্ধ্যা ৮টার মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের মতে, হোস্টেল এখন বিশ্রামের জায়গা নয়, বরং এক ধরনের বন্দিশালায় পরিণত হয়েছে।

করিম আক্ষেপ করে বলেন,একসময় কলেজটা আমার দ্বিতীয় বাড়ি ছিল। এখন মনে হয় জেলে আছি। ইচ্ছে হয়, আমি যেন কখনোই এখানে না আসতাম।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি 

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪