এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক: শীতের স্নিগ্ধ সকালে ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকালেই মনটা অতীতে উড়ে যায়। বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন সম্রাট, আমাদের সবার প্রিয় ‘নায়করাজ’ রাজ্জাকের জন্মদিন। অথচ নেই বলার মত কোন আয়োজন। একজন চলচ্চিত্র সাংবাদিক হিসেবে অসংখ্য মহাতারকার সান্নিধ্য পেয়েছি, কিন্তু রাজ্জাক ভাই ছিলেন এক আলাদা পাহাড়সম ব্যক্তিত্ব যার হৃদয়ে ছিল মাটির টান, আত্মসম্মান আর কাজের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা।
অভিনয়ের প্রতি আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ আর অনুগত্যের মধ্যে যে ভারসাম্য রাজ্জাকের ব্যক্তিত্বে ছিল, সেটাই তাকে ‘নায়করাজ’ বানিয়েছিল।
রাজ্জাকের জীবন কোনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আকবর হোসেন, মা নিসারুননেছা। পড়াশোনা শুরু হয় কলকাতার বাঁশদ্রোণীর খানপুর হাইস্কুলে। সপ্তম শ্রেণিতে ‘বিদ্রোহী’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অভিনয়ের আগুন জ্বলে ওঠে। ১৮ বছর বয়সে মুম্বাই পর্যন্ত পাড়ি দিলেও তাঁর গন্তব্য ছিল ঢাকার রুপালি পর্দা।
রাজ্জাকের সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীর। ১৯৬২ সালে তাদের বিয়ে হয়। লক্ষ্মীর আসল নাম ছিল খায়রুন্নেছা, কিন্তু পরিবারের ডাকনাম লক্ষ্মী হয়ে যায়। রাজ্জাকের জীবনযুদ্ধের প্রতিটি ধাপে এই নারী ছিলেন তাঁর শক্তির উৎস।
১৯৬৪ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ভয়ে রাজ্জাক ঢাকায় আশ্রয় নেন। স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে রেখে তিনি পরিচালক আব্দুল জব্বার খানের সহযোগিতায় শুরু করেন নতুন জীবন। কমলাপুরে ছোট ঘরে বসে শুরু হয় সংগ্রাম। ১৯৬৪ সালে তিনি ‘উজালা’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে লখিন্দরের চরিত্রে অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রবেশ করেন। এরপর ‘আনোয়ারা’, ‘দুই ভাই’, ‘সংসার’, ‘পীচ ঢালা পথ’—একের পর এক সফল ছবি উপহার দেন তিনি।
১৯৭০ সালে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবির ফারুক চরিত্রে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান। পরবর্তীতে শাবানা ও ববিতার সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে অমর হয়ে যায়। ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘অবুঝ মন’, ‘রংবাজ’, ‘আলোর মিছিল’, ‘ছুটির ঘণ্টা’—এই তালিকা শেষ করা যায় না। প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
রাজ্জাক শুধু ক্যামেরার সামনে নায়ক ছিলেন না, ক্যামেরার পেছনেও সফল পরিচালক। তাঁর ‘রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন’ থেকে নির্মিত বহু কালজয়ী ছবি নির্মিত হয়। মোট ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। ‘জ্বীনের বাদশা’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘সন্তান যখন শত্রু’, ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’—এই ছবিগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন। ‘বাবা কেন চাকর’ ছবিটি টালিউডেও পুনর্নির্মিত হয়ে ব্যাপক সফলতা পেয়েছিল।
বাংলা চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজ্জাক ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ লাভ করেন। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে এবং ২০১৩ সালে তাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন।
২০১৭ সালের ২১ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি বিশাল অধ্যায় শেষ হয়।
আজ নায়করাজ রাজ্জাক আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও ব্যক্তিত্ব আজও অমলিন। শূন্য থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের সম্রাট হয়ে ওঠা এই মহীরুহের জীবন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। জন্মদিনে প্রিয় রাজ্জাক ভাইকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা—যতদিন বাংলা ভাষাভাষী মানুষ থাকবে, আপনি হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় মহাতারকা।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি